সহযোদ্ধার ভাবনাবিশ্ব 

হাজারের জিনিস বিকায় লাখে, মাছ কি আর লুকায় শাকে

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 2 মিনিট

আজকাল বড় ক্লান্ত লাগে। কত আর লিখি। বালিশের দাম সাত হাজার লিখে বিস্ময়বোধক চিহ্ন দিতেই পর্দার দাম হয়ে যায় সাইত্রিশ লাখ। টিন বিকায় রূপার দামে। একপাতা টিনের দাম একলাখ। রূপা নয় তো কি? কোন সে মন্ত্রে টিনও রূপা বনে যায়। তেল আর ঘিয়ের অনুপাত হাতে হাত রেখে দাঁড়ায়। হামেশার এই অনুপাত আর কত ধরে লেখায়! প্রতিদিন অংকের ক্লাশ, সংখ্যা বাড়ে দুর্নীতির বিদ্যালয়ে। আমরা জানি এমন বিদ্যালয়ের শিক্ষক কারা। তবুও মানুষ রামগরুড়ের ছানা, বলতে তাদের মানা। 

দুর্নীতির সংজ্ঞাও ক্রমে পরিবর্তিত হচ্ছে। দুর্নীতি মানেই লুকিয়ে-চুরিয়ে কিছু করা, এমনটাই ছিলো এক সময়। এখন দিন বদলেছে। দিন বদলের জ্বিন বদলে দিয়েছে সব কিছু। হালে দুর্নীতি নয়, চলে লুটপাটের মহো‌ৎসব। পাঁচশ টাকার বালিশ যখন সাত হাজার টাকা, দু হাজার টাকার পর্দা কিনে সাইত্রিশ লাখে। উল্টো এসব হয়ে যায় ছিচঁকে ঘটনা, দিন বদলের তালে তাল না মেলানো মানুষেরা বিস্মিত হয়। একশ-দুশ টাকার জন্য যারা দিনভর দৌড়ায়, তাদের চক্ষু হয় চড়কগাছ। কিন্তু তারপরেও গা করেন না মহাজনরা। মহাজনদের সামান্যতে গা করতে নেই। 

সাতটা সাইনবোর্ড বানাতে লাগে সাতাশ লাখ টাকা। সিল-ছাপ্পড় বানাতে তিন লাখের অধিক। অসম্ভব কিছু নয়। সাইনবোর্ডটা বড় বেশি প্রয়োজন। আজকাল তো সাইনবোর্ডই সব। যদি সাইনের বোর্ডটা জুতসই লেগে যায়, তবেই কেল্লাফতে। তাহলে পড়াশোনার পাশাপাশি আপনি হয়ে উঠতে পারেন, উদীয়মান ধনী লোক। শিক্ষা জীবনেই সবচেয়ে দামী গাড়িটি হতে পারে আপনার। উঠতে পারে আলিশান বাড়ি। অফ দ্যা রেকর্ডে নারীও থাকতে পারে। কোনো অসুবিধা নেই। সাইনবোর্ডটা জুতসই হলেই হলো। 

দিন বদলের জ্বিন আমাদের নানা সুবিধা দিয়েছে। আমরা এখন কানাডাকে ছাড়িয়ে যেতে চাই। লসএঞ্জেলসের চোখে লাগাতে চাই ধাঁধা। সিঙ্গাপুরকে বলি ‘লাগ ভেল্কি লাগ, আমাদের পেছনেই থাক’। নজরুলের মতন বলতে চাই, ‘উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ব বিধাত্রীর’! অথচ বাদ সাধে কতিপয় মানুষ। এদের চিন্তা খুব ‘পুউর’। এরা ‘স্কাই স্ক্র্যাপার’ দেখে না, এরা দেখে নোংরা বস্তি। এরা হাতির ঝিল দেখে না, দেখে বেহাত হয়ে যাওয়া ‘অমুক-তমুক’ বিল। এদের চোখে পড়ে না ক্রম দৃশ্যমান মেট্বো রেল, এদের চিন্তায় থাকে মিন্নি’র জেল। বড়ই অদ্ভুত। দিন বদলের জ্বিন কেনো যে এদের বদলালো না!

সত্যি আজকাল বড় ক্লান্ত লাগে। লিখতে লিখতে আঙুল অবশ হয়ে আসে। ক্ষয়ে যাওয়া কিবোর্ড জানান দেয়, বয়স হয়েছে। যৌবনে লেখা শুরু করেছিলাম, এখন বার্ধক্যের শুরুতে। চোখের সামনে অনেকে বদলে গেলেন। মফস্বল থেকে আসা লাজুক ছেলেটা হয়ে উঠলো তুখোড় স্মার্ট। এখন সে মফস্বলকে নিন্দা করে। সমালোচনাকে বলে মফস্বলী কাজ। পাড়ার বাপ খেদানো ছেলেটা এখন দামী গাড়ি দৌড়ায়। আর সবচেয়ে মেধাবী ছেলেটা ধুঁকে চাকরির খোঁজে। অবসরে যাওয়া স‌ৎ বড়কর্তার টিনশেড বাড়ির পাশেই উঠে কেরানির ‘হাইরাইজ’। কেরানিরা ক্রমেই বড়কর্তাকে ছাড়িয়ে ‘রাইজ’ ‘হাই’ হয়ে যায়। এসব দেখে সত্যি আজকাল বড় ক্লান্ত লাগে। এখন আর লিখতে ভাল্লাগে না, নিজের প্রতিই ঘেন্না হয়। ব্যর্থতা আর অক্ষমতার ঘেন্না।

পুনশ্চ : নিবারণ চক্রবর্তী থেকে শুরু করে আহমদ ছফা, সবাইকে বড় বোকা বোকা মনে হয়। দিন বদলের জ্বিন হালের কবি আর বুদ্ধিজীবীদের তরক্কির নানা তরিকা শিখিয়েছে। চক্কোত্তি আর ছফা’রা বড়ই পিছিয়ে তাদের থেকে। আমরা তো কোন ছাড়।

ফুটনোট : আমাদের হা-হুতাশের আড্ডায় এক পুঁচকের কাটা ছড়া, ‘হাজারের জিনিস বিকায় লাখে, মাছ কি আর লুকায় শাকে’। লেখার শিরোনাম সেটাই। 

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment