কাব্য গাহন 

সাঈদ বিলাস-এর কবিতাগুচ্ছ

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 5 মিনিট

কবি

১.
কবি-
এই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন বৃক্ষ,
বিস্তৃত এক বন সৃজন করে চলে,প্রাণের স্পন্দনে-!
বয়ে চলে,বয়ে চলে-
বাতাসে রেণু ছড়ায় প্রাণের বিপুল সম্ভাবনায়।
২.
কবি-
ভালোবেসে কিংবা না বেসে
এক পাহাড়সম বেদনা-
এই জগতের সমান বয়সী ভালোবাসায়-
জীবনের সীমাহীন,সীমাহীন ভারত্বের সাক্ষ্য নিয়ে
হেঁটে চলে পৃথিবীর পথে পথে,জীবনের বাঁকে বাঁকে।
৩.
কবি-
ভাঙে-গড়ে
আবার ভাঙে,আবার গড়ে!
এক অনন্ত চক্রাবর্তে-
জীবনের সাথে খেলে যায়-আজীবন!
৪.
কবি-
এক অভিশপ্ত নগরী!
খুঁজে ফেরে অন্তর্গত ঘৃণার এক জমিন-
খুঁড়ে তুলে নেয়, তার ভালোবাসার পবিত্র হেমলক!
পান করে যায় আজীবন-
হৃদয়ের,হৃদয়ের একান্ত তৃষ্ণায়।


ফ্যাসিস্ট বাতাসে মুখ লুকাই গোপনে

বিবিধ যন্ত্রণা
বিবমিষার মতন
তোমার আবছায়া শরীর-
চষে বেড়ায় ব্যর্থ পুরুষ-!
কবি ক্ষয়ে যায় তার ব্যর্থ শব্দের লানতে।

আহাজারি শেষ হলে-দূরে
খোকসার বনে, শোনা যায়
আম্মার মিহি সুরের করুণ বিলাপ!
সেই সাথে ভেসে উঠে
আব্বার হাসিহীন রাগত মুখের করুণ রেখাচিত্র।

সেই সুর-সেই মুখ
ভালোবাসায় ঢাকা গোপন রহস্য য্যানো!
কবি ক্ষয়ে যায় তার ব্যর্থ শব্দের লানতে।

আমিও ফিরি কার্যত-
এক রাজনৈতিক লোনলি হাওয়ার মৌসুমে;
ফ্যাসিস্ট বাতাসে মুখ লুকাই গোপনে
তোমার নাভিমূলকে কেন্দ্র করে রচিত বৃত্তে।
অথচ,
কবি ক্ষয়ে যায় তার ব্যর্থ শব্দের লানতে।

কসম তোমার

কসম তোমার-
একদিন ঠিকই জ্বালিয়ে দিবো
বিস্তৃত শূয়োরের খোঁয়াড়!

ধানক্ষেত-মাঠ-ঘাট পেরিয়ে
কলকারখানা ছড়িয়ে
নতুন ব্যারিকেড দিবো রাস্তার মোড়ে মোড়ে,
প্রতি ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে-!

আগুয়ান চোখে মরণ নিশানায়
রক্ত ঘামের শিল্পের নিপুণতায়
এই অহঙ্কারের হেডকোয়ার্টার
টুকরো টুকরো করে
চাষ করবো নতুন ফুল।

সেই ফুলের সুবাসে
জেগে থাক মানুষের অন্তর্গত প্রাণের স্পন্দন!

ধর্ষণ

আহত,ক্ষুব্ধ আর বিস্ফোরণ্মুখ যোনীর ভেতর ঢুকছে বাংলাদেশ।
এই সুপ্ত জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি থেকেই জন্ম নেবে আগামীর অদমনীয় যোদ্ধারা।

জাতীয়তাবাদ


পাহাড়ে-
ছয়জন নিরীহ মাছ শিকারীকে
ওরা গেঁথে দিলো ব্রাশফায়ারের জালে,
তিনজন মরে গেল অন দ্য স্পটে
আর তিনজনকে আহত অবস্থায় নিয়ে গেল
জলপাই রঙের বুনো বাইসনগুলো।

মনে হচ্ছে গেঁথে নিয়ে গেল আমাকেই,
রক্ত মাংসসমেত শিকারীর নির্মম উৎসাহে-!
আমাকে নিয়ে গিয়ে রাখা হবে,বাঙালি জাতীয়তাবাদের টর্চার সেলে।
খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কিংবা পিটিয়ে পিটিয়ে আরো কিছুক্ষণ রক্তাক্ত করা হবে আমাকে জাতীয়তাবাদের নামে।
আমাকে শেখানো হবে কেন আমি বাঙালি নই!
বুঝিয়ে দেয়া হবে আমাকে,অধীনস্ত থেকে নিজের অধিকার চাওয়ার পরিণাম কী নির্মম ও নিষ্ঠুর হতে পারে!

বরং এই পাহাড়-জুম-দিগন্ত বিস্তৃত প্রকৃতি আমাদের একান্ত আপনার
পাহাড় আমার আত্মার আত্মীয়, আমার ঘর, আমার ঠিকানা, আমার প্রাণ!
অথচ জলপাই রঙের বুনো বাইসন ও তাদের প্রভুরা কেড়ে নিচ্ছে আমার অধিকার সুচতুর কৌশলে।
আমার বুকে ছুরি মেরে বলা হচ্ছে আমি নাকি তোমাদের ভাই,
আমার ভিটা কেড়ে নিয়ে বলছো আমি যেন হাসিমুখে থাকি
আমার দিকে বন্দুক তাক করে অথবা গলায় অস্ত্র ঠেকিয়ে বলছো
আমরা আর তোমরা যেন গলাগলি করে থাকি!

কী হাস্যকর নির্মম সম্প্রীতির গলাগলি!
নির্লজ্জ বুদ্ধিবেশ্যাজীবীতা!
অথচ মাছ শিকার করবার কথা ছিল আমাদের শান্ত সুশীতল বাতাসে আরামে!
তোমরা কেড়ে নিয়েছ আমার খাবার, আকর্ণ বিস্তৃত হাসি;
আমার ঘর-বাড়ি, সন্তান, প্রিয়তমা, বন্ধুর মতো ভাই-বোন, এমনকি আমাকেও-
জীবন থেকে!

বস্তুত সারা পৃথিবীতেই আমি দখল হয়ে গেছি
জাতীয়তাবাদের বন্দুকের নলের মুখে।
আমি দখল হয়ে গেছি কাশ্মীরে, দখল হয়ে গেছি আমি ফিলিস্তিনে
নিজ ভূমে পরবাসী আমি-
ইয়েমেন, রাখাইন, চীন কিংবা আফ্রিকায়!
এমনকি আমি দখল হয়ে গেছি তোমাদের গণতন্ত্রের দেবদূত আমেরিকায়ও।
আমাকে নিয়ে ফুটবল ফুটবল খেলা হচ্ছে দুনিয়াজোড়া।

কিন্তু ভুলে যেও না, আমাকে দখল করা যায় আপাত
দখল হয়েছে হয়তোবা আমার পূর্ব পুরুষরাও,
কিন্তু থেমে থাকে নি আমাদের বেঁচে থাকবার-অধিকারের লড়াই।
মানুষ হলো বানের জলের মতোন
যখন বাইতে শুরু করবে, চারিদিক প্লাবিত করে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে-
তোমাদের এই জাতীয়তা, কাঁটাতার কিংবা টর্চার সেল
ও আরো যা যা অবরুদ্ধকরণ মেশিন আছে সব, সব!

পৃথিবীটা মানুষেরই হবে একদিন- দেখে নিও!
এই মানুষ মুক্তির সংগ্রামে পোড় খাওয়া মুক্ত ও স্বাধীন এক পাখি হবে!
আমিও সেই পথেরই যাত্রী!

আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর

তুলে নিয়ে গিয়ে রাখা হল-আমাকে
এক অন্ধকার কুঠুরীতে।
লোহার নলের ফাঁকে
দেখছি- গুলি অথবা মৃত্যু!
হাত,পা,মুখ বাঁধা অবস্থায় মাথায় সজোরে আঘাত
এরপর আর কিছু মনে নেই।

জ্ঞান হারাবার আগে শুধু মনে হল
একগাদা চাপ কিংবা সংসারের হিসাবের পাহাড়।
সব পড়ে আছে-বোকা বউটা সামলাবে কিভাবে?

শূন্য মাথায় কিংবা মানসিক চাপেই হয়তোবা
শুনছি এখনো কথা বলতে না পারা আমার মেয়েটার
অনর্গল বোকার মতো হাসি- হাসতে হাসতেই গড়াগড়ি খাচ্ছে
সম্বিৎ ফিরে পেতেই মেয়ের হাসি মিলিয়ে যায় হাওয়ায়-!

আগ্নেয়াস্ত্রসমেত কিছু ঠাণ্ডা মাথার খুনির অশ্লীল হাসি ভাসে বাতাসে
আমাকে তারা বলছে-দৌঁড়া বাইনচোদ,দৌঁড়া
আমি ভাবছি দৌঁড়ে আর কী হবে?-দৌঁড়াচ্ছি তো জন্মের পর থেকেই!
আমার,আমাদের জীবন মানেই তো দৌঁড়।

কিছুক্ষণ থেমে থেকে দিলাম দৌঁড়-
যদি মেয়েটার হাতের আঙ্গুলগুলো ছুঁয়ে দেয়া যায়,
যদি বোকা বউটার অভিমানী মুখটা আবার দেখা যায়!
কিংবা হিসেব মেলে সংসারের অথবা জীবনের।

খানিকবাদে গুলির শব্দ
মরে যাওয়ার আগে টের পাই
মাটি ভিজে গেছে আমারই রক্তে-মানুষের রক্তে!

তারপর…
তোমাদের মুখস্ত প্রেসনোট
অথবা বাইনচোদ মার্কা পরিসংখ্যান;
অথবা আজীবন বাবা ডেকে বাবার দেখা না পাওয়া
একটা দুঃখী মেয়ের বেদনার্ত মুখ।

আপনি শুকরিয়া আদায় করুন

আপনি শুকরিয়া আদায় করুন যে
আপনাকে চাষাবাদ করতে হয় না!
আপনে চাষাবাদ করলে বুঝতেন,
প্রতিমণ ধানে দুইশত টাকা করে গচ্চা দেয়ার পরও
মুখে হাসি ধরে রাখা কত কঠিন কাজ!

আলুর উৎপাদন খরচ উঠাতে না পেরে
রাস্তায় আলু ঢেলে প্রতিবাদ করতে করতে বুঝতেন,
জিডিপি,মাথাপিছু আয়,উন্নয়নের গান এইগুলা আসলে ফাঁকিবাজি -বড়লোকের পকেট ভরার তত্ত্ব।

আপনি শুকরিয়া আদায় করুন যে
আপনি কৃষক নন,
আপনাকে চাষাবাদ করতে হয় না!
বরং ভাতের টেবিলে বসে কৃষকরে গাঁইয়া-ক্ষ্যাত-অশিক্ষিত-আনকালচারড-ব্ল্যাডি বলে গালি দিতে দিতে এখনো সংস্কৃতি চোদাতে পারছেন; মদের গ্লাস হাতে নিয়া চিপস বা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই চাটতে চাটতে আলুর উপকারিতা নিয়ে লেকচার চোদাতে পারছেন।

আপনি শুকরিয়া আদায় করুন যে
কৃষক এখনো চাষাবাদ বন্ধ করে অস্ত্র হাতে নেয় নি,
কৃষক অস্ত্র হাতে নিলে,রাষ্ট্রের দিকে বন্দুক তাক করলে,
তখন আপনি বুঝবেন আপনার এই উন্নয়ন,নানা বস্তাপঁচা থিউরি,জাতীয়তাবাদ,মোরালিটির নামে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন,শ্রেণিগত আগ্রাসন আর শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির নামে মানুষ বিভাজনের আত্মম্ভরিতা-
কিভাবে বুদবুদের মতোন হাওয়ায় কিংবা শূন্যে মিশে যায়!

আপনি শুকরিয়া আদায় করুন যে
আপাতত আপনাকে কৃষক হতে হয় নি বা কৃষক এখনো অস্ত্র হাতে তুলে নেয় নি।
আপনি শুকরিয়া আদায় করুন যে
আপনাকে পোশাক শ্রমিকের মতো দাসোচিত জীবন বেছে নিতে হয় নি,
কিংবা হতে হয় নি প্ল্যাস্টিক কারখানার শ্রমিক,অথবা আপনার জীবনের প্রয়োজনীয় ও বিলাসিতার সকল উপাদান বানায় যারা, সেই রকম কোনো শ্রমিক হতে হয় নি আপনাকে।

ফলে আপনি শুকরিয়া আদায় করুন যে
গরম-শীত-বসন্ত কিংবা যে কোনো সময় আপনি আপনার পছন্দমতো কাপড় বাছাই করে গায়ে চাপাতে পারেন।
এসির শীতল বাতাসে কিংবা ফ্যানের আরামদায়ক হাওয়ায়-
আয়েশে চোখ বুজে রবীন্দ্র,নজরুল,গজল কিংবা আধুনিক গান শুনতে শুনতে ভাবালুলতার ভেতর হারিয়ে যেতে পারেন;কিংবা রক গান,মেটাল বা হেভি মেটাল শুনতে শুনতে উন্মত্ত মাদকতার ভেতর যেতে পারেন নিমেষেই বা ভিড়ের ভেতর স্তন চেপে দিয়ে বলতে পারেন এটাই আধুনিকতা।

অথবা বাড়িতে কাজের মেয়েটার সকল অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে, তাকে বাধ্যতামূলক বন্দীত্বে রেখে, আপনি মুক্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারেন কিংবা সভা সেমিনারে বিশাল বিশাল বক্তৃতায় গাইতে পারেন নারী মুক্তির গান।

আপনি শুকরিয়া আদায় করুন যে
আপনি হন নি হকার কিংবা পাটকল শ্রমিক,
যাদের সব সময় উচ্ছেদের ভয়ে থাকতে হয় কিংবা মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে, বউ বাচ্চা নিয়ে আধপেটা হয়ে থাকতে হয়।
তাই গতর না খটিয়েও তিনবেলা পেটপুরে খাইতে পারেন
আর আস্তিক নাস্তিক বিতর্কে পেটের ভাত হজম করতে পারেন।

আপনি শুকরিয়া আদায় করুন যে আপনি অটোমেশন শ্রমিক না
তাই নির্দ্বিধায় কী বোর্ডে প্রতিবাদের ঝড় তুলতে পারেন বারংবার!
আপনি শুকরিয়া আদায় করুন যে
আপনাকে যে কোনো ধরনের শ্রমিক হিসেবে জীবন বেছে নিতে হয় নি!
তাহলে বুঝতেন কাজ করতে করতে কিভাবে পাছা ক্ষয় হয়ে যায় কিংবা অভারটাইম করতে করতেও যখন জীবনের হিসাব মেলে না, তখন কিভাবে মেরুদণ্ডের হাড় ক্ষয় হতে থাকে টের পেতেন!
আপনি টের পেতেন আগুনে ভস্ম হয়ে কিংবা মাটির নিচে চাপা পড়ে মালিকের লোকসানের খাতায় কিভাবে লাভের হিসাব বাড়াতে হয় জীবনের হিসাব চুকিয়ে।

আপনি শুকরিয়া আদায় করুন যে
আপনাকে এর কোনোটাই করতে হচ্ছে না।
বরং পেটের দায়ে পাওনা মজুরি পেতে শ্রমিকরা যখন রাস্তায় নামছে,
আপনি তাদের উন্নয়ন বিরোধী,দেশদ্রোহী,উচ্ছৃঙ্খল বলে গালি দিতে পারছেন,টক শো চোদাতে পারছেন, কলাম চোদাতে পারছেন!
আপনি শুকরিয়া আদায় করুন যে
শ্রমিকরা এখনো আপনার টুটি চেপে ধরে বলে নি-
মাদারচোদ,আমার অধিকার আমি ছিনিয়ে নিবোই,আটকানোর তুই কে?

আপনি শুকরিয়া আদায় করুন যে
আপাতত শ্রমিকরা এর কোনোটাই করছে না!
তারা এখনো অস্ত্র হাতে তুলে নেয় নি কিংবা রক্তের বদলে এখনো রক্ত চায় নি,বরং এখনো মৌন দাবী দাওয়ার আন্দোলন করছে।
আপনি শুকরিয়া আদায় করুন যে
আপনাকে কৃষক বা শ্রমিক কোনোটাই হতে হয় নি।

আর যদি শুকরিয়া আদায় করতে না পারেন,
তাহলে আপনার রক্তকণিকার কাছে জবাব চান-
শোষণের শৃঙ্খলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
আপনার নিউরণের কাছে জবাব চান-
অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে মুখ বুঝে অন্যায় সহ্য করার জন্য।
জবাব চান আপনার প্রিয়তম বা প্রিয়তমার কাছে-
দালালী করে এই অন্যায়কে দীর্ঘ মেয়াদে এগিয়ে দেয়ার জন্য!

আরও পড়ুনঃ

২ Thoughts to “সাঈদ বিলাস-এর কবিতাগুচ্ছ”

  1. নাঈম সিনহা

    কবি-
    এই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন বৃক্ষ,
    বিস্তৃত এক বন সৃজন করে চলে,প্রাণের স্পন্দনে-!
    বয়ে চলে,বয়ে চলে-
    বাতাসে রেণু ছড়ায় প্রাণের বিপুল সম্ভাবনায়।

    1. সাঈদ বিলাস

      ঠিক তাই!

Leave a Comment