দিনলিপি 

সাংবাদিক ফাগুন রেজা হত্যার এক বছর : পিতা হিসাবে বলছি, বিচার পাবো কি?

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 3 মিনিট

চারিদিকে দুর্যোগ। করোনাতো রয়েছেই সাথে সাইক্লোন আম্ফান। এরমধ্যে আমার ফাগুনের, সাংবাদিক ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন হত্যাকান্ডের এক বছর পূর্ণ হলো আজ। ২১ মে, গত বছরের এই দিনেই আমার ছেলেটাকে হত্যা করা হয়েছিলো। এক বছর পরেও সেই হত্যাকান্ডের তদন্ত শেষ হয়নি। গ্রেপ্তার হয়নি খুনিরা। অথচ পুলিশের হাতে রয়েছে অনেক সূত্রই। তারপরেও অদৃশ্য কারণে এখন পর্যন্ত বড় কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি। কেনো পড়েনি, এই প্রশ্নটা এখন কার কাছে করি। তারমধ্যে দেশে চলছে এই দুর্যোগ। প্রতিদিন চোখের সামনে মৃত্যু দেখতে পাচ্ছে মানুষ।

সন্তানের হত্যার শিকার হওয়া এবং তার বিচারের জন্য অপেক্ষা করা একজন পিতার জন্য যে কতটা কষ্টের তা বুঝতে পারবে শুধু আরেকজন সন্তান হারানো পিতা। এছাড়া এ অনুভবের ক্ষমতা কারো নেই। এখন মাঝেমধ্যে মনে হয় দায়িত্বশীল কারো যদি এমন বিষাদের সম্মুখিন করাতেন বিধাতা। পরক্ষণেই মনে হয়, এমন কষ্ট যেনো শত্রুকেও না দেন তিনি। আমিতো বেঁচে আছি, অন্যের হয়তো তা সইবার ক্ষমতা নাও থাকতে পারে।

গতবছর ২১ মে’র সকালে বাসা থেকে বের হলো ফাগুন। ভোরবেলা আমিই তুলে দিলাম। এগিয়ে দিলাম গলির মোড় পর্যন্ত। আমার চোখের সমুখ দিয়ে সটান হেঁটে গেলো ছেলেটা। আমি কী জানতাম, এই পথে আর হেঁটে ফিরবে না সে। রাতে পাওয়া যাবে তার প্রাণহীন দেহ রেললাইনের ধারে। সারারাত গাড়ি নিয়ে কত হাসপাতাল, কত থানায় খোঁজ নিয়েছি ওর। পাইনি। পরদিন বিকালে খবর পেলাম, ফাগুনকে কবর দেয়া হচ্ছে বেওয়ারিশ হিসাবে জামালপুর কবরস্থানে। বলুন তো, একজন পিতার মানসিক অবস্থা। আমি যে বেঁচে আছি এই তো বেশি। এই যে লিখছি, আমার চোখের সামনে জ্যান্ত হয়ে উঠছে সমস্ত দৃশ্যপট। সে বর্ণনা আর লেখা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। একজন পিতার পক্ষে বারবার তার ছেলের মৃত্যু দেখা কী করে সম্ভব হয়!

অসম্ভব মেধাবী আমার ছেলেটা। সব কিছুই জানা চাই তার। প্রয়োজনীয় সব কিছুই তার জানা। সারাদিন পড়ার মধ্যেই ছিল সে। না, পাশ করার জন্য পড়া নয়, জানার জন্য পড়া। সাহিত্য থেকে বিজ্ঞান, ধর্ম থেকে দর্শন সব পড়া চাই ওর। সব জেনে নেয়ার চেষ্টা। জানার জন্য এতটা উদগ্রীব, এতটা আগ্রাসী আমি কাউকে দেখিনি। নিজ ছেলে বলে নয়, আমার নিজের পেশার খাতিরেই অনেকের সাথেই পরিচয় হয়েছে আমার, তাই নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি।

একদিনের ঘটনা বলি। আমার নিজের লেখার জন্য একটা বিষয়ে জানার প্রয়োজন হলো। গুগল ঘাটলাম, তেমন কিছু পেলাম না। একজন গুণী মানুষকে ফোন করলাম, না উনিও বেশি কিছু বলতে পারলেন না। যদিও ভরসা পাচ্ছিলাম না তবু ফাগুনকে ফোন করে বললাম, এ ব্যাপারে জানিস কিনা? মুহূর্তেই ঝরঝর করে বলে গেলো সে বিষয়ের উপর। মনে হলো কোনো বিশেষজ্ঞের কথা শুনছি। আশ্চর্য হওয়ার সাথে সাথে গর্ব হলো। তবে তার প্রকাশ হতে দিলাম না। এমন ঘটনার কথা কটা বলবো, অনেক রয়েছে। ওর কাছ থেকে অনেক বিষয় জেনে নিয়েছি আমি। এখনো লিখতে গিয়ে আটকে গেলে অজান্তে ফোনের দিকে হাত চলে যায়। হায়, ফাগুন। আমার অহংকার।

একটা একুশ বছরের তরুণের মধ্যে, এতটা মেধা, এতটা সততা, এতটা প্রতিশ্রুতির সমন্বয় কিভাবে হয়, এটা এখনো আমি ভেবে উঠতে পারি না। এমন বিরল সমন্বয়ের কারণেই হয়তো প্রকৃতি চায়নি সে থাকুক। এক্সট্রিম বিশুদ্ধতা নাকি প্রকৃতি সইতে পারে না। হয়তো সে কারণেই আমার ছেলেটার চলে যেতে হয়েছে। বিচারহীনতার এমন পর্যায়ে এখন এসব ভেবেই সান্ত্বনা পেতে হয়। কী আর করার আছে। কাকে বলবো, কার কাছে বলবো, আমার কষ্টের কথা, যাতনার কথা। সাগর-রুনি’র ছোট্ট মেঘ বড় হয়ে গেলো বিচারহীনতার কষ্ট বুকে চেপে। তনু-মিতু এমন আরো কতজনের পিতা-মাতা-সন্তানের বুকে চেপে আছে কষ্টের পাথর। তাদের না হয় আমিও একজন।

এক বছর হয়ে গেলো ফাগুন নেই, আমার বিশ্বাস হয় না। মনে হয় কাল রাত্রেও ডেকে বলেছে, আব্বুজি সাহরি খাবে না? এত চমৎকার করে ও আব্বুজি ডাকে। এখনো সেই ডাক স্পষ্ট শুনতে পাই, আর চমকে ‍উঠি। মাঝেমধ্যেই রাতের বেলা মনে হয় এই বুঝি ও এসে বলবে, আব্বুজি এটা কি তুমি জানো? না বাবা, আমি কিছুই জানি নারে। জানলে কী তোকে হারাতে হতো। মানুষ আসলে কিছুই জানে না, জানার ভান করে মাত্র। যারা জানে, তারা তোর মতো দূরে চলে যায়। প্রকৃতি চায় না, তাকে কেউ জেনে ফেলুক।

এমন দুর্যোগের কালে নিজেকে বড় অসহায় লাগে। ভরসার জায়গা না থাকলে অসহায় লাগারই কথা। আমার ছেলেটা ছিলো আমার ভরসার জায়গা। আমার গার্ডিয়ান। আমার ভুল ধরিয়ে দেয়ার, আমার সাহস জোগানোর উৎস। এখন নিজেকে ছাদহীন গৃহের মতন মনে হয়। এমন হবে কখনো কি ভেবেছিলাম। বারবার মনে হয়, আমি কেনো? কখনোতো কারো অমঙ্গল কামনা করিনি। যতটা সম্ভব মানুষের ভালো করারই চেষ্টা করেছি। আমার ছেলেটাতো মানুষ কেনো, কোনো প্রাণিরও ক্ষতি করেনি। রাস্তায় অভুক্ত কুকুরের জন্যও প্রাণ কেঁদেছে ওর। খাবার কিনে খাইয়েছে। তাহলে আমাদের কেনো এমন হবে?

সারাজীবন ধরে মানুষের অধিকারের কথা বলেছি। আমার পিতাও বলতেন। মানুষের ন্যায় বিচারের পক্ষে দাঁড়িয়েছি, বলেছি আমরা সবসময়। এখনো মানুষের জন্যই লিখে যাচ্ছি। আমার ছেলেটাও সেই একই পথে চলা শুরু করেছিলো। গণমাধ্যমে যোগ দিয়েছিলো, বাপ-দাদা’র পরম্পরা রাখতেই। মানুষের কথা বলতে, মানুষের অধিকারের কথা বলতে। হয়তো আমাদেরই ভুল ছিলো। হয়তো আমরা ছিলাম ভুল পথে। এদেশে অন্যের অধিকারের কথা বলার চেয়ে নিজের আখের গোছানোটাই সঠিক। মানুষের কথা বলার চেয়ে মেরেকেটে সেকেন্ড হোম বানিয়ে, গোঁফে তা দিয়ে চলার পথটাই ছিলো সঠিক।   

ছেলেটা আমার ইংরেজিতে এত ভালো ছিলো। এ দেশের গণমাধ্যমে এমন ছেলে ছিলো দুর্লভ। যে ছেলেটা সহজেই স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে যেতে পারতো। আরাম আয়েশে কাটাতো পারতো জীবন। ক্ষেত্রতো প্রস্তুতই ছিলো। কিন্ত না, ফাগুন চায়নি দেশ ছেড়ে যেতে। দেশের টানেই পরে ছিলো সে। যেমন ছিলো ওর দাদা। যেমন এতকিছুর পরেও রয়ে গেছে ওর বাবা, এই আমি। আমি নিজেও হয়তো আমার পিতার সাথে নিজ নামকে ক্যাশ করে ঝোলে-ঝালে কাটাতে পারতাম জীবন। কিন্তু ওই যে সততা আর দেশপ্রেম। এ দুটি বিরল রোগের কারণেই হয়তো আমাদের এই অবস্থা। আমার ছেলেটাকেও সেই রোগের বলি হতে হলো। আমাদের মতন দেশে সততা ও দেশপ্রেম এ দুটো রোগ করোনার চেয়েও ভয়াবহ। আমাদের মতন দেশের মানুষের হয়তো এ দুই উপসর্গ থাকতে নেই। থাকা উচিত নয়।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও নিহত সাংবাদিক ফাগুন রেজা’র বাবা।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment