সহযোদ্ধার ভাবনাবিশ্ব 

সাংবাদিকতা কি ক্ষমতাশালীদের পক্ষে জনসংযোগ?

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 2 মিনিট

সাংবাদিকদের দাবি দাওয়া, বহু না বলা কথা বলা, মনের রাগ ক্ষোভ অথবা সুখ আনন্দের কথা বলার জায়গাগুলো দলাদলিতে পরিপূর্ণ হয়েছে অনেকদিন। না, কোনও রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করাকে আমি সাংবাদিকতার নীতিবিরুদ্ধ কিছু মনে করছি না। কিন্তু দলাদলির ঊর্ধ্বে উঠে যখন নিজেদের অধিকার নিয়ে আমরা কথা বলতে পারি না; তখন সেই রাজনৈতিক চৈতন্যকে আমি ঘৃণাই করবো। এমন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের নানাবিধ বক্তব্য তুলে ধরার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ‘সংবাদকর্মীর দিনলিপি’কে আমি অভিনন্দন, শুভেচ্ছা, শুভকামনাসহ যা যা জানানো যায় সব জানিয়ে লেখা শুরু করলাম।

আজ আমি যে বিষয়টি বলতে চাই সেটি হলো আমরা যারা সাংবাদিকতায় একেবারেই নতুন তাদের নিয়ে। আমরা হয়তো অনেকেই জানি না, বর্তমান সময়ে এমনও অনেক সংবাদকর্মী আছেন যাদের বেতন সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি গণমাধ্যমে তো তরুণ সংবাদকর্মীদেরকে ৮ হাজার, ১২ হাজার টাকায়ও চাকরি করতে দেখেছি। মানে আমি বলতে চাচ্ছি একজন শিক্ষানবিশ সংবাদকর্মীর সর্বোচ্চ বেতন ১৫ হাজারের হিসেব দিতে পারলেও সর্বনিম্ন কত সেটি বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলোতে কোনও ধরনের বেতন বৃদ্ধির (ইনক্রিমেন্ট) খবর নেই গত দুই তিন বছর। আবার এমনও প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে বেতন বাড়ে ঠিকই কিন্তু সেটি পরিমান এতোই কম যে সেটি পাওয়া আর না পাওয়া সমান কথা। কেউ কেউ আবার মাসের পর মাস বেতন দিচ্ছে না, সেটিও কারও অজানা নয়। কিন্তু তার বিপরীতে কী হচ্ছে?

এসবের বিপরীতে যেটা হচ্ছে, একজন সংবাদকর্মীকে ৮ ঘন্টার কথা বলে ১২ থেকে ১৩ ঘন্টা খাটানো হচ্ছে। যেসব ঘটনা সংবাদযোগ্যই নয়, সেসবের পেছনে দৌড়ঝাঁপ করিয়ে মাথাটাকেই ভোঁতা করে দেওয়া হচ্ছে। শেখানো হচ্ছে- একটি দলের সভাপতি, সেক্রেটারি প্রতিদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে যাই বলবেন তাই নিউজ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঠিক মতো তার দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হচ্ছে কিনা, কথিত ক্রসফায়ার রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞ কিনা সেসবের অনুসন্ধানের কোনও উপায় নেই। বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে এমবেডেড হয়ে তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে তারা কোথায় কোথায় অভিযান পরিচালনা করলো সেটির পেছনেই সারাদিন পড়ে থাকাই সাংবাদিকতা। এই যে প্রতিদিন নানা ধরণের উচ্ছেদ, ভেজাল বিরোধী অভিযান হচ্ছে, সেসব কী প্রতিদিনই নিউজ হবার মতো? নাকি অভিযান কাদের বিরুদ্ধে হয়, কাদের বিরুদ্ধে হয় না কিংবা নাকি অভিযানের পর অভিযুক্তরা কতোটুকু সচেতন হলো, অভিযানে কোনও নিরপরাধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হলো কিনা এসব বের করা সাংবাদিতা? প্রতিদিন বিভিন্ন অভিযান ফলো করার নামে (তা ভেজালবিরোধী হোক আর জঙ্গিবিরোধী হোক) আমরা যেসব সংবাদ কাভার করি তা অভিযান পরিচালনাকরী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে পিআর (জনসংযোগ) করা ছাড়া আর কিছুই নয়।  মাসের পর মাস কী করে এসব করা যায়, আর কী করে তাকে সাংবাদিকতা বলা যায়?

গণমাধ্যমের কাজতো কেবল তথ্য প্রদান আর বিনোদিত করা নয়। ‘টু এডুকেট’ বলে একটা দায়িত্বের কথাও বলা হয় সাংবাদিকতার ধ্রুপদী বিদ্যায়। সেই কাজ কি করছে বাংলাদেশের গণমাধ্যম? নাকি কেবল বিভিন্ন ব্যক্তি আর প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পিআর (জনসংযোগ) করে যাচ্ছে? হয়তো অনেকে বালিশ কাণ্ড বা ডিআইডি মিজান বা বিভিন্ন ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসতে চাইবেন। আমি সেসব অস্বীকার করছি না। গণমাধ্যমই এসব বিষয় সবার সামনে নিয়ে এসেছে। তারপর সংশ্লিষ্টরা নড়েচড়ে বসেছে। কিন্তু এইরকম কয়টা রিপোর্ট হচ্ছে মাসে? এই যে তরুণ একটা প্রজন্ম যে এসেছে সাংবাদিকতায়, এরা তো ভেজাল বিরোধী অভিযান আর উচ্ছেদ অভিযান, ঈদের সময় শপিংমল আর গরুর হাঁট থেকে লাইভ, আগুনের লাইভ ইত্যাদি দিয়েই সময় পার করছে। এদের যে তৈরি করা, মানে রিপোর্টার বানানো সেটির ঘাটতি অবশ্যই আছে বলে আমি মনে করি। এই ঘাটতি আমি অনুভব করি।

আমার মনে হয়, যে পরিমাণ বেতন তার কয়েকগুন পরিশ্রম করিয়ে এবং সাংবাদিকতার নামে ক্ষমতাশালীদের পক্ষে জনসংযোগ করিয়ে তরুণদের ভবিষ্যত নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে একজন সাংবাদিক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে যা দরকার, সেটির ঘাটতি একজন তরুণ হিসেবে আমি প্রতিনিয়ত অনুভব করি। সম্মানজনক বেতন আর অনুসন্ধানী মনকে উসকে দেওয়ার পাশাপাশি যদি প্রচুর গবেষণা আর লেখাপড়া নির্ভর রিপোর্ট করতে উৎসাহিত করা না যায় তবে ভবিষ্যত আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। আজকাল ফেসবুক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেখি: সেলিব্রেটি সাংবাদিক হতে চাও, তবে আমাদের কাছে আসো।

যেনো নাচ শেখাবে, তারপর দর্শক নাচাবে।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment