যে ঘটনা খবর হয়নি 

সময়ের তাড়া খেয়েই কি ‘তাড়ুয়া’ শতবর্ষের পুরনো গল্পে ছদ্মবেশ নিয়ে হাজির হয়েছে?

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 4 মিনিট

বেইলি রোডের মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে বসে মৃদু আলোয় শুনছি মঞ্চের এক কর্নারে বাদ্যযন্ত্রীদের বাজানো মুগ্ধকর সুর। হঠাৎ বেল বেজে উঠলো। লাইট নিভে গেলো। শোরগোল চলছে। একজন দৌড়ে পালাচ্ছে। তাকে ধাওয়া করছে পুলিশ। এরপর তাকে খুঁজে পায়। পুলিশের টর্চ লাইটের আলোতে লোকটির ভীত মুখ দেখতে পাই। তারপর নিভে যায় আলো। গুলির শব্দটি বলে দেয়- ক্রসফায়ার। যেখানে ক্রসফায়ার থাকে সেখানে আঁধার নামে এটাই নিয়ম। একমাত্র অন্ধকার সমাজেই আমরা ক্রসফায়ারের অস্তিত্ব অনুভব করি। মঞ্চের ওই আর্তনাদ আমাদের কাঁপিয়ে দেয়। মঞ্চায়িত নাটকটির নাম মাথা থেকে বের করে এনে নিজে নিজেই মঞ্চের সামনে একটি কাল্পনিক স্ক্রিন বানিয়ে তুলে দিলাম- ‘লেট মি আউট’।

আমরা বেইলি রোডের এই মঞ্চ থেকে চলে যেতে চাই আপাতত হলিউডে নির্মিত সিনেমা চেঞ্জলাইন (changeline) এ। এই সিনেমায় ক্রিস্টিন কলিন্স নামে এক মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। সে মা তার হারিয়ে যাওয়া সন্তান ওয়াল্টার কলিন্সকে খুঁজতে নেমে লস অ্যাঞ্জেলেসের তৎকালীন দুর্নীতিপরায়ণ এবং নির্যাতক পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামেন। এটি ১৯২৮ সালের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত। মূল ঘটনাটি ছিলো, সেই সময়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র ক্রায়ার তার দুঃশাসন টিকিয়ে রাখতে পুলিশকে যা খুশি তা করার ‘ফ্রি-লাইসেন্স’ দিয়েছিলেন। আর এমন জবাবদিহিতাবিহীন ক্ষমতা পেয়ে ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল পুলিশ। তারা দুর্নীতি, লুটপাট, নির্যাতনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। স্পেশাল ফোর্সের নামে গড়ে তোলে ক্রসফায়ার এবং গুম করার এক ভয়ঙ্কর বাহিনী। যাদের কাজই হচ্ছে মেয়রের বিরোধীদের দমন করা। সেই সাথে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ করতে গেলেও নেমে আসতো ভয়ঙ্কর পরিণতি। শহরজুড়ে এমন একটা আতঙ্কময় এবং দুঃশাসন বিরাজ করছিলো। হারিয়ে যাচ্ছিলো বিভিন্ন বয়সের মানুষ। তাদের ভেতর আছে শিশুরাও। ১৯২৮ সালের এক মার্চ মাসে হারিয়ে যায় ক্রিস্টিন কলিন্সের ছেলে ওয়াল্টার কলিন্স। পুলিশে অভিযোগ দিয়েও কোন হদিস পাচ্ছিলেন না। এই অবস্থায় শহরের একটি গীর্জার ফাদার ক্রিস্টিন কলিন্সের পক্ষ নিয়ে কথা বলা শুরু করেন। তখন বিষয়টি আরো আলোচিত হয়। এই পরিস্থিতিতে ৫ মাস পর পুলিশ একটি ছেলেকে এনে হাজির করে বলে, তারা হারিয়ে যাওয়া ওয়াল্টারকে খুঁজে এনেছে। কিন্তু ক্রিস্টিন কলিন্স বলে এটা তার সন্তান না। পুলিশ বিষয়টা অস্বীকার করে নিজেদের কথা সত্য প্রমাণে বিভিন্ন কান্ড ঘটায়। নিজস্ব চিকিৎসক ডেকে এনে ওই ছেলেকেই ওয়াল্টার হিসেবে প্রমাণ করায়। কিন্তু সত্য প্রতিষ্ঠায় লড়ে যায় ওই মা। এক পর্যায়ে পুলিশ তাকে চরিত্রহীন প্রমাণের চেষ্টাও চালায় এবং এক সময় তাকে পাগলা গারদে পাঠায়। সেখানে গিয়ে ক্রিস্টিন কলিন্স আবিষ্কার করেন ১২ নম্বর সেলে তার মতো এমন আরো অনেক নারী বন্দি আছে যারা পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গিয়ে আটক হয়েছে। তবে ক্রিস্টিন কলিন্স লড়াই থামাননি। সেই ফাদারও চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন তার পক্ষে।

এই হচ্ছে মূল গল্প। এর উপর ভিত্তি করেই হলিউডে ক্লাইন্ড স্টুড নির্মাণ করেন চেঞ্জলাইন (changeline)। আর ঢাকায় নতুন নাটকের দল ‘তাড়ুয়া’ মঞ্চস্থ করেছে ‘লেট মি আউট’। দুটি প্রোডাকশনেই একটি কমন বিষয় হচ্ছে পুলিশি রাষ্ট্রের নির্যাতনের চিত্র। পুলিশ নিজেদের মিথ্যাকে সত্য প্রমাণে কত ভয়াবহ কর্মকাণ্ড ঘটাতে থাকে তার নমুনা দেখা যায়। প্রায় শত বছর আগের এই গল্পটি যখন তাড়ুয়ার নাট্যকর্মীরা মঞ্চে পরিবেশন করছিলেন নিজেদের মতো করে, তখন দর্শক হিসেবে আমরা তার ভেতরে খুঁজে পেয়েছি আমাদের বর্তমানকে। এই ঢাকাকে। এই বাংলাদেশকে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শব্দ আমাদের কানে আটকে যায়। আমরা নাড়া খেয়ে ভাবি নাটক আর বাস্তবতার দূরত্ব কতটুকু এখানে?

লেট মি আউটের একটি দৃশ্যে দেখা যায়, পুলিশ হেনরি নামের এক বিপ্লবী শ্রমিককে ধরে আনে। পুলিশ তাকে বলে তুমি কেন মেয়রের বিরুদ্ধে যাচ্ছো কেন তাকে মারতে চাচ্ছো…? তোমার অনাগত সন্তানের ভবিষ্যতে কথা কেন ভাবছো না? হেনরি উত্তরে বলে- ভবিষ্যত! যে রাষ্ট্র ঠিক নেই, সেই রাষ্ট্রে ভবিষ্যত কোথায়? উত্তেজিত পুলিশ কর্মকর্তা বলে ওঠে ‘ইউ আর টেরোরিস্ট’ । উত্তরে হেনরি বলে, ‘ইউ টেরোরিস্ট! ইউ কিল পিপল উইদাউট জাস্টিস।’ এই বাক্যটি আমাদের মনে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে নানা ভাবে। মঞ্চে দুর্দান্ত এক দৃশ্যায়ন ঘটে তখন। এক পিতাকে যখন ক্রসফায়ারে দেওয়া হচ্ছে, ঠিক তখন তার সন্তানও জন্ম নিচ্ছে। মহাকালের এক মাহেন্দ্রক্ষণ তখন। বিপ্লবী হেনরি মারা যাচ্ছে, কিংবা আবার ফিরে আসছে নতুন করে জন্ম নিয়ে! আমরা এই দৃশ্য থেকে আশায় সঞ্চারিত হবো? নাকি বাস্তবতায় ঢুকে শুনে নেবো আরও একবার সেই অডিও টেপ- ‘আব্বু তুমি কান্না করতেছো যে…’ আমরা নিঃশব্দে বসে থাকি। আড় চোখেও তাকানো হয় না, কোনোদিকে কারো দিকে…। কখনও সময় আমাদের পাথর করে দেয়।

ওই মায়ের লড়াই আমরা দেখতে থাকি। ফাদারের চেষ্টায় পাগলা গারদ থেকে মুক্তি পেয়ে ক্রিস্টিন কলিন্স আদালতে যায়। এখানে আমরা হলিউডে চলে যাই। নির্মাতা ক্লাইন্ড স্টুড আদালতে তুমুল লড়াইয়ে এই কেসের সমাপ্তি দেখিয়েছেন তার সিনেমায়। কিন্তু লেট মি আউটে- …তুমুল লড়াইয়ের এক পর্যায়ে বিচার হলো কি হলো না কিংবা বিচার আছে কি নেই সেই কুহকে আটকে রইলাম আমরা। এই গল্পে শেষ পর্যন্ত লস অ্যাঞ্জেলেসের পুলিশ কর্তাদের শাস্তি হয়েছিলো। বাতিল হয়েছিলো পুলিশ কর্তৃক সরাসরি পাগলা গারদে পাঠানোর আইনও। চেঞ্জলাইন (changeline) সিনেমাটি শেষ হয়েছিলো হোপ (HOPE) নামের একটি শব্দ দিয়ে। কারণ, তারা যখন সিনেমাটি বানিয়েছে (২০০৮ সাল), ততোদিনে তারা তাদের নাগরিক জীবনে অনেক কিছুই আদায় করতে পেরেছে। নাগরিকদের কাছে সরকারের জবাবদিহিতার জায়গাটা আরো শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু আমাদের নাটকের দল ‘তাড়ুয়া’ তেমন কোনও শব্দ তাদের পরিবেশনায় শেষ করতে পারেনি, তেমন কোনও আশার ছবি আমাদের দেখায়নি। পর্দা নামার পর মিলনায়তন থেকে বের হতে হতে মনে হলো, যে অন্ধকার টানেলে আমরা ঢুকে পরেছি সেই অন্ধকারে ‘তাড়ুয়া’ বোধহয় তেমন কোনও শব্দ কিংবা আলোর রশ্মি খুঁজে পাচ্ছে না আমাদের মতোই। সুন্দর পরিবেশনা, মুগ্ধকর মিউজিক এবং সময়ের দরজায় কড়া নেড়ে যাওয়ায় তাড়ুয়াকে অভিনন্দন। সময়ের এই তাড়া খেয়েই বুঝি তাড়ুয়া এমন শত বছরের পুরনো গল্পের ছদ্মবেশ নিয়ে হাজির হয়েছে। তাদের যাত্রা শুভ হোক।

লেখক: তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সংবাদকর্মী

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment