সহযোদ্ধার ভাবনাবিশ্ব 

সব গাছ ছাড়িয়ে এক পায়ে দাঁড়ানো তালগাছ আমরা

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 2 মিনিট

প্রায় দেড়শ কোটির দেশ চীন। করোনা ভাইরাসের আতুরঘর। সেখানের চেয়ে করোনা আক্রান্তের সংখ্যায় আমরা এগিয়ে গেছি সতেরো কোটির দেশ হয়ে। আর কিছুতে না হোক এই সংখ্যায় তো অতিক্রম করেছি, এটাই বা কম কিসে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। জনসংখ্যা একশ বিশ কোটি ছাড়িয়ে। আক্রান্তের গড় তুলনায় আমরা এগিয়ে। আক্রান্তের সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে অ্যামেরিকা। যে হারে এগুচ্ছি সেটাকেও ধরে ফেলবো সম্ভবত।

করোনাতে এগুনোর হারের সাথে আরেকটা জায়গায় আমাদের মিল রয়েছে। সেটা বিশ্বে দ্রুত ধনী হওয়া মানুষের হারটিতে। গবেষণা সংস্থা ‘ওয়েল এক্স’ এর পরিসংখ্যানে আমাদের কিছু লোক বিশ্বের ধনী হওয়ার দৌড়ে প্রথম হয়েছে। তেমনি করোনাতেও কেউ আমাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। ইতোমধ্যেই সেটা আমরা প্রমান করতে পেরেছি। উপরে চীন আর ভারতের কথাতো বললাম। আরো অনেক উন্নত দেশকেই আক্রান্তের সংখ্যায় পেছনে ফেলে এসেছি। অবস্থা যা তাতে হয়তো মৃত্যুর সংখ্যাতেও পেছনে ফেলতে পারবো।

এগিয়ে যাবার নজিরের অভাব অন্তত আমাদের নেই। কুয়েতে আমাদের এমপি সাহেব ধরা পড়লেন। না, ছোটখাটো কোন কান্ড ঘটিয়ে নয়। আমাদের অবস্থা ‘লুটতো ভান্ডার মারো তো গন্ডার’ এর মতন। স্বয়ং কুয়েতের পুলিশ বিভাগ বলেছে, মানবপাচার চক্রের মূল হোতাকে গ্রেপ্তার করেছে তারা। সুতরাং দৌড়ে আমরা এদিকেও এগিয়ে। আমরা হলে সর্দারই হবো, সেটা ডাকাতের হলেও।

যাক গে, আরো অনেক দিকে আমরা এগিয়ে। চীন-জাপান-অ্যামেরিকার চেয়ে বেশি খরচে আমরা রাস্তা, রেললাইন বানাই। সেতু বানাতে আমাদের খরচ অন্য কারো চেয়ে বেশি। হাসপাতালে যন্ত্রপাতি কেনার দামে সবাইকে ছাড়িয়ে একপায়ে দাঁড়ানো তালগাছ আমরা। আমাদের ধারেকাছে কেউ নেই। আইটি বিষয়ে বলেন। আরে ভাই, আমাদের পাঁচটা সফ্টওয়্যার কিনতে যে পরিমান ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়, তা বিলগেটসের কল্পনাতেও আসবে না। এরপরেও বলতে সাহস হবে কারো, আমরা পিছিয়ে আছি!

এই এগুনোর আনন্দে আমরা সব সময় উৎসবের মুডে থাকি। দেখুন আমাদের এখানে কোনো না কোনো উৎসব লেগেই আছে। আমরা ফানুস উড়াই, আতশবাজি পোড়াই। সাথে আমাদের স্বপ্ন উড়ে, আমাদের কপাল পোড়ে। তাতে আমাদের কিচ্ছু আসে যায় না। আমাদের ঘরে ভাত নেই, কিন্তু আমরা জিডিপি’র পোলাও খাই। মনে মনে আওরাই, ‘কম খাই নাহি খেদ, বেশি খেলে বাড়ে মেদ’।

হ্যাঁ, আমরা স্বাস্থ্য সচেতনও বটে। দেখুন না, এই করোনাকালে কিছু পাবলিক ফেসবুকে লাইভ করে বেড়ায়। আমাদের উপদেশ দেয় স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে। প্রোটিন হিসাবে ডিম, মাছ-গোশত আর ফল-মূল খাবার জন্য বলেন তারা। ‘এক যে বোকা শেয়ালে, লাগলে ক্ষুধা মুরগি এঁকে দেয়ালে আপন মনে চাটতে থাকে খেয়ালে’, আমরাও উনাদের উপদেশ মেনে সেই ‘বোকা শেয়াল’ হয়ে যাই। আপন মনে মরিচ আর নুন ডলা ভাতকেই প্রোটিন ভেবে কল্পনায় খাই ডিম, মাছ-গোশত। ফুটপাত আমাদের ঘর হয়ে উঠে, আকাশটা ছাদ। সমগ্র পৃথিবীটাকেই কল্পনায় গৃহ ভেবে নিই এই লকডাউনের কালে। যারা বলেন, ঘরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন, তাদের মুখের উপর অট্টহাস্যে বলি, দেখুন এই পৃথিবীটাই আমাদের ঘর। আকাশটা ছাদ হয়ে ঢাকে আমাদের।

পুনশ্চ: লকডাউনে অনলাইন ক্লাশ চালু নিয়ে গলাবাজী চলছে। সামাজিকমাধ্যমে এক শিক্ষার্থীর জিজ্ঞাসা, ‘যারা বন্ধ থাকায় গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছেন, যাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সঙ্গতি নেই, তারা কী করে ক্লাশ করবে?’ গলাবাজদের গলায় এ বিষয়ে কোনো বাণী নেই। তারা অনলাইনে শিক্ষার আলো জ্বালাতে ব্যস্ত! এদের জন্যই সম্ভবত ‘গাল্লি বয়’ এর র‌্যাপ, ‘শিক্ষার আলো নাকি ঘরে ঘরে জ্বলবে, আমাদের ঘর নাই সে কথা কে বলবে?’ আছেন কেউ বলার?

লেখক : সাংবাদিক ও বিশ্লেষক।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment