সহযোদ্ধার ভাবনাবিশ্ব 

সংবাদে বসত

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 5 মিনিট

বড় হয়ে কী হতে চাও; এ প্রশ্নটির উত্তর দিতে দিতেই বেড়ে উঠতে হয় বেশিরভাগ শিশুকে। স্বজন কিংবা পরিপার্শ্ব নয় কেবল; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও ‘জীবনের লক্ষ্য’ নামে রচনা লিখিয়ে নেয় আমাদেরকে দিয়ে। ফলে নিজের মতোন করে একটি লক্ষ্য স্থির করা কিংবা মস্তিষ্কে ভবিষ্যত স্বপ্নের বীজ বপন করার আগেই পারিবারিক আকাঙ্ক্ষা কিংবা পাঠ্যপুস্তকে থাকা ‘জীবনের লক্ষ্য’ রচনা মুখস্থ করিয়ে দেওয়ায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে হয় অনেক শিশুকে। পেশা বা কর্মক্ষেত্রের ব্যাপকতা-বৈচিত্র্য বুঝে ওঠার আগেই আমরা মুখস্ত আওড়াতে থাকি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পেশার নাম- ‘বড় হয়ে আমি ডাক্তার  হবো’ নয়তো ‘আমি ইঞ্জিনিয়ার হবো’, অথবা হালের যুগবাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ‘আমি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হব’… আমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। একইরকমের লক্ষ্যের কথাই ঘুরে ফিরে এসেছে আমার মেয়েবেলায়।

শৈশবে কখনও ভাবিনি বড় হয়ে সংবাদ জগতে পা রাখব। আমিও মুখস্ত বলে দিতাম বড় হয়ে ডাক্তার হবো। তবে মনে মনে কিন্ত ঠিকই ভাবতাম, ‘অন্যরকম’ কিছু একটা করতে হবে। সে ‘অন্যরকম কিছু’ কী, তা অবশ্য আর সুনির্দিষ্ট করতে পারতাম না। তবে হ্যাঁ, মুখস্তভাবে বলা জীবনের লক্ষ্যের বাস্তবায়ন দেখতে আমার মা-বাবা আমাকে চাপ প্রয়োগ করেননি। সেদিক থেকে আমাকে ভাগ্যবানই বলা যায়।

স্কুলের ছাত্র থাকাকালেই জীবনের বৈচিত্র্যময় লক্ষ্যের সন্ধান পেলাম বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বড় বোনের সুবাদে। বিজ্ঞান থেকে এসএসসি পাস করার পরই বদলে গেলো আমার বিভাগ। হিউম্যানাটিজ নিলাম ইন্টারমিডিয়েটে। স্বভাবতই পরিবারের পক্ষ থেকে আমাকে আর ডাক্তার বানানোর কথা চিন্তা করার সুযোগ রইলো না। পরিবারের স্বপ্ন বদলে গেলো, এবার বাবা চাইলেন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়াশোনা করব। কথা কম বলার স্বভাব আমার, তাই বাবার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমি শঙ্কিত ছিলাম। ভাবতাম আমার মতো কম কথা বলা মানুষ আইন নিয়ে পড়াশোনা করে কী করে সফল হবে। বাবার দিক থেকে পাল্টা যুক্তি ছিল, বলতেন, ‘মা, তুমি বিচারক হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য তো কথা বলতে হয় না, বিবেক জাগ্রত রাখতে হয়।’

যখনকার কথা বলছি, ততোদিনে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল একুশে’র আবির্ভাব ঘটেছে। সরকারি প্রচারণামাধ্যম বিটিভির বাইরে ভিন্ন আমেজে ‘নিরপেক্ষ’ সংবাদ উপস্থাপনের পরিসর সৃষ্টি হয়েছে। একুশে’র কারণেই সে সময় টেলিভিশন সাংবাদিকতা অনেকের কাছে খুব প্রার্থিত পেশা হয়ে উঠেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উতরে যাওয়ার পর এলো বিষয় নির্ধারণী সাক্ষাৎকারের পালা। সঙ্গে গেলেন বাবা, মামা আর বড় বোন। লাইনে দাঁড়িয়ে দেখতে পেলাম আইন বিভাগের জন্য নির্ধারিত আসন পূরণ হয়ে গেছে, অন্য কোনও বিষয় নিতে হবে। বাবা, মামা আর বোনের পরামর্শে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগকে বেছে নিলাম ভর্তি হওয়ার জন্য। তবে তাদেরকে শর্ত দিয়েছিলাম, ভালো না লাগলে পরবর্তীতে বিভাগ পরিবর্তন করে ফেলব। ক্লাস শুরুর পর মনে হলো ‘না এখানকার পড়াশোনাটা একটু অন্যরকম’। ‘অন্যরকম কিছু’র সন্ধান হয়তো পেয়ে যাচ্ছি। মনে মনে এর জন্য পরিবারের সদস্যদের ধন্যবাদও দিলাম। কারণ, ক্লাস শুরুর পর জানতে পারলাম সাংবাদিকতা বিভাগে মেয়েদের ভর্তি হওয়ার হার তুলনামূলকভাবে কম, পারিবারিকভাবে তাদেরকে নিরুৎসাহিত করা হয়। সেক্ষেত্রে আমার পরিস্থিতি তো পুরোপুরি উল্টো হওয়ায় আমি আমার পরিবারকে নিয়ে খানিকটা গর্বিত বোধ করতে পেরেছিলাম।

সাংবাদিকতা বিভাগে ছাত্র থাকাকালে পত্রিকায় কন্ট্রিবিউটর হিসেবে টুকটাক কাজ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ যখন প্রায় শেষের দিকে তখন তিন বন্ধুর ফেলোশিপের (নারী সংবাদকর্মীদের উৎসাহিত করার জন্য) সুযোগ হয়ে যায়। ওই ফেলোশিপের আওতায় আমাদেরকে পাঠানো হয় একটি বেসরকারি টেলিভিশনে তিন মাসের ইন্টার্নশিপ করতে। সেখানকার সহকর্মীদের আন্তরিকতা আর সহায়তায় বেশ ভালোভাবে আমাদের ওই পর্ব শেষ হয়। এরমধ্যেই অন্য একটি নতুন বেসরকারি টেলিভিশনে আবেদন করে রেখেছিলাম। সেখান থেকে পরীক্ষার জন্য ডাকা হলো। তিন বন্ধুর চাকরি হলো (বন্ধুরা মিলে একই জায়গায় চাকরি করব এমন একটা স্বপ্নও তৈরি হয়ে গিয়েছিলো ততোদিনে)। খুব আনন্দ হচ্ছিলো। মনে হলো, যাক এমন একটা চ্যানেলে কর্মজীবন শুরু হচ্ছে যেখানে চ্যানেলটির শুরু থেকেই আমাদের সম্পৃক্ততা থাকছে। কিন্তু অভিজ্ঞতটা ভালো হলো না। প্রথমবারের মতো টের পেতে বাধ্য হলাম, কর্মক্ষেত্র হলো শ্রমশোষণ আর কর্তৃত্ববাজির চাষাবাদের এলাকা, স্বপ্নভঙ্গ হলো আমাদের। হতাশ হয়ে বন্ধুরা একযোগে চাকরি ছেড়ে দিলাম। সময়টা ছিল শিক্ষা জীবন শেষ করে কর্মজীবনের শুরু, তাই হয়তো জীবিকার তাগিদ তখনও রক্তের তেজ আর জেঁদকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। এরপর একুশে টেলিভিশনে চাকরি প্রার্থী হিসেবে পরীক্ষা দিলাম। এবারও বন্ধুরা একসঙ্গে। হয়েও গেল। কিন্তু সেখানকার বেতন কাঠামো আমাদের হতাশ করলো। সেজন্য কাজে যোগ দিলাম না। কয়েক মাস বাড়িতেই কাটিয়ে দিলাম।

পারিবারিকভাবে জীবিকার তাগিদ না দেওয়া হলেও ব্যক্তিগতভাবে ততোদিনে জীবিকার তাগিদ বোধ করতে শুরু করলাম। বুঝতে পারলাম জীবন চালাতে গেলে জীবিকা-দাসত্বের কাছে নতি স্বীকার না করে উপায় নেই। ফলে আবারও একুশে টেলিভিশনে চাকরিপ্রার্থী হিসেবে পরীক্ষা দিলাম এবং প্রথম কর্মস্থলের চেয়ে পাঁচ হাজার টাকা কম বেতন নিয়েই যোগ দিলাম সেখানে। সহকর্মীদের আন্তরিকতা আর সহযোগিতায় কয়েক দিনের মধ্যেই হতাশা অনেকখানি দূর হয়ে গেলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজনকে সঙ্গে পেলাম এখানে (সেও পরবর্তীতে অবশ্য কর্মস্থল পরিবর্তন করে এনজিওতে চলে যায়)।

একুশে টেলিভিশনে কাজ শুরু হয় ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে। নতুন কর্মস্থলে এসে গড়ে উঠলো নতুন বন্ধুত্ব। বাধন দা’র সঙ্গে পরিচয় হলো, চিন্তার একটা নতুন পরিসর পেলাম। তার সঙ্গে যৌথ কাজের মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করতে শুরু করলাম পেশাগত নানা সীমাবদ্ধতা, অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও মানবতার পক্ষে সংবাদ লিখে কিভাবে আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়। সংবাদকে কিভাবে ক্ষমতাশক্তির অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে এবং জনমুখী আর প্রতিরোধের জায়গা থেকে উপস্থাপন করা যায়। একুশে টেলিভিশন ছেড়েছি আমরা, তবে বিচ্ছিন্ন হোইনি। একইসঙ্গে চাকরি বদল করেছি, আজও আমরা বিচ্ছিন্ন নই, কাজ করি একসাথেই।

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে কাজ করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের যুদ্ধ, নিপীড়ন, বৈষম্য ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার থাকার চেষ্টা করি আমরা। সংবাদ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের প্রাধান্যের কেন্দ্রে থাকে মানুষ। নারী ও শিশুর প্রতি সর্বোচ্চ সংবেদনশীল অবস্থান থেকে আমরা সংবাদ লিখি।  ধর্মীয় ও বর্ণগত বিদ্বেষের বিপরীতে সম্প্রীতির বন্ধনকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করি। বিভিন্ন পরাশক্তির ক্ষমতা-দ্বন্দ্ব, যুদ্ধবাজির সংবাদের ক্ষেত্রেও আমরা সবথেকে গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করি এর ফলে সৃষ্ট মানবিক আর্তিকে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রকৃতি ও প্রতিবেশের ওপর এর প্রভাব, এর বিরুদ্ধে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মসূচি এবং প্রাণ-প্রকৃতির বিপন্নতার খবরগুলোকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি। কেবল পেশা নয়, আমাদের যাপন-বাস্তবতাতেও সংবাদ বিষয়টি এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য। কী করে সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে সমাজের মঙ্গল করা যায়, কী করে সংবাদমাধ্যমকে জনবিরোধী ভূমিকা থেকে জনমুখী ভূমিকার পাটাতনে দাঁড় করানো যায়, তা নিয়ে আমরা নিত্য আলাপরত থাকি। অফিসের বাইরেও পারিবারিক সম্মিলন স্থলে কিংবা ফেসবুকের মেসেজে, ফোনের টেক্সট-এ, কিংবা রাস্তায় চা খেতে খেতে আমাদের চিন্তাধারার পারস্পরিক বিনিময় ঘটে।

টেলিভিশন সাংবাদিকতা ছেড়ে অনলাইন সাংবাদিকতা করতে এসেও নিজেদের অবস্থানের বদল ঘটেনি আমাদের। অনলাইনে পাঠক ধরে রাখার জন্য কথিত ‘হিটভিত্তিক নিউজ’ এর পেছনে না ছুটে একইরকম করে সংবাদ লিখে যাচ্ছি আমরা। আমাদের বর্তমান কর্মস্থল অনলাইন সংবাদমাধ্যম হলেও হিটের পেছনে দৌড়ানোর তাগিদ দেয় না। বরং সংবাদকে যথাযথভাবে ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে উপস্থাপন, সেক্সিস্ট কনটেন্ট বর্জনের অবস্থান রয়েছে আমাদের প্রতিষ্ঠানের। সে কারণে, আমরা পাঠককে আমাদের সঙ্গেও পেয়েছি। বাংলা ট্রিবিউনের আন্তর্জাতিক সংবাদকে আমরা দেশে প্রশংসিত এবং পাঠকপ্রিয় করতে সমর্থ হয়েছি আমাদের নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। তারপরও সংবাদ রচনা করে কি সব কথা বলা যায়? না, যায় না। কিছু সীমাবদ্ধতা তো থেকেই যায়। সেই সীমাবদ্ধতাটুকুকে যেন সুনির্দিষ্ট করা যায়, সেই লক্ষ্য নিয়েই যাত্রা শুরু করলো সংবাদকর্মীর দিনলিপি। এখানে বাধন দা’র সঙ্গে আমরা ক’জন সহযোদ্ধা মিলেছি সংবাদের মধ্য দিয়ে না বলতে পারা কথাগুলো বলার জন্য।

শুধু কর্মপরিসর নয়, আমার বৈবাহিক বাস্তবতাও একার্থে সংবাদসূত্রেই গাঁথা। সংবাদকর্মীদের কাজের ধরন, ডিউটি, সময় এগুলো বেশিরভাগ পেশাজীবীর থেকে আলাদা। রাত-বিরাতে অফিস করার মানসিকতা থাকতে হয় সংবাদকর্মীদের। বেশিরভাগ পেশাজীবীর কাছে যে দিনটি সাপ্তাহিক ছুটি সে দিনটি সাংবাদিকের জন্য সাপ্তাহিক ছুটি নাও হতে পারে। সপ্তাহের অন্য কোনও একটি দিনে নিতে হয় ডে অফ। ‌ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে যারা কাজ করেন তাদের দুই ঈদের মধ্যে একটিতে ছুটি মেলে তো আরেক ঈদে করতে হয় অফিস ডিউটি। তবে আমিতো পেশাটি পরিবর্তন করতে চাইনি কখনও। তাই পেশাজীবনে প্রবেশের পর যখন একটু একটু করে আমার বয়স বাড়তে শুরু করে, আমাদের সমাজ-নির্ধারিত নিয়মে যখন তা প্রায় বিয়ের বয়স পার হয়ে যাওয়ার অবস্থায় চলে যায়; তখন খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। বিশেষ করে নারী সংবাদকর্মীদের ক্ষেত্রে বৈবাহিক সম্পর্ক যাপনের প্রশ্নটি খুব চ্যালেঞ্জিং। বিপরীতের মানুষটি যদি ভিন্ন পেশার হয়, তাহলে তার সঙ্গে বোঝাপড়া হবে কিনা সে দুশ্চিন্তা ভর করেছিল আমার মনে। আমার পেশা বুঝবে তো? রাতবিরাতে বাইরে থাকাটা স্বাভাবিকভাবে নেবে তো, এইসব দুশ্চিন্তা আমাকে ভর করেছিল। এমন সময় হঠাৎ করেই দেখা পাই শাহরিয়ার অনির্বাণের। সেও সংবাদ জগতেরই মানুষ, একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার। আমাদের দুইজনের মধ্যে মতের মিল যেমন আছে, তেমনি অমিলও আছে। তবে আমরা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ডে অফে মিল থাকে না অনেক সময়ই, দেখাও খুব বেশি একটা হয় না পরস্পরের, তা সত্ত্বেও রাতে যখন দুইজনে বাসায় ফিরি তখনও আমাদের আলাপের জগতকে আচ্ছন্ন করে রাখে সংবাদ। এ যেন সংবাদেই বসতি। 

লেখক: সংবাদকর্মী

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment