কথোপকথন দিনলিপি 

সংবাদকর্মী খোরশেদ আলম-এর দিনলিপিতে বানভাসী মানুষের বিপন্নতা

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 4 মিনিট

‘প্রথম আলো’র তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল সংবাদকর্মী খোরশেদ আলম। কাজ করেন বগুড়া জেলার প্রতিনিধি হিসেবে। তবে বন্যার্ত মানুষদের বিপন্নতা সরেজমিন পরিদর্শনে সদ্য তিনি গাইবান্ধা ঘুরে এসেছেন। নিবিড় মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন বানভাসী মানুষের আর্তনাদের চিত্র। দিনলিপির সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে খোরশেদ বগুড়া ও গাইবান্ধার মানুষের বিপন্ন পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাধন অধিকারী

প্রথম আলো পত্রিকার বগুড়া জেলা প্রতিনিধি খোরশেদ আলম

উত্তরবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতির একাংশ সরেজমিন প্রত্যক্ষ করেছেন আপনি। কী কী দেখলেন?

আমি বগুড়া এবং গাইবান্ধার বন্যা কাভার করেছি। দুই জেলার প্রেক্ষাপট আলাদা। গাইবান্ধায় প্লাবিত হয়েছে লোকালয়। বিশেষ করে শহরের মধ্যে পানি ঢুকেছে। সদর, ফুলছড়ি, সাঘাটাসহ চারটি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে। অঞ্চলগুলো ব্রহ্মপুত্র নদের পানিতে একাকার হয়ে গেছে। সাধারণত নদীর চরের বাসিন্দাদের বন্যা নিয়ে আগাম প্রস্তুতি থাকে। কিন্তু গাইবান্ধার অধিকাংশ এলাকার মানুষের তা ছিল না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বন্যার পানি ঘরের মধ্যে ঢুকে গেছে। চর বাদে কেউ ঘরে সংরক্ষিত খাবারটা সঙ্গে নিয়েও বের হতে পারেনি। এমনকি ঘরে সংরক্ষিত ধানও রক্ষা করতে পারেনি কেউ। চাল, ডাল, ধান সব পচে গেছে বস্তার মধ্যেই। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উপজেলা ভবন, বাঁধ, বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে মানুষ। হাজার হাজার মানুষ উঁচু সড়কে পলিথিনের তাবু টাঙিয়ে এখনও অবস্থান করছেন। সঙ্গে রেখেছেন গরু। আমি সবগুলো এলাকায় গেছি গাইবান্ধার। এমনকি চরেও। গবাদিপশুর অবস্থা আরও খারাপ। আবার অনেক চর বিলীন হয়েছে। গাইবান্ধা সদরের চিথুলিয়া চরের প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষের বসতি ছিল। ১২ থেকে ১৬ জুলাইনের স্রোতে সব তলিয়ে গেছে। ২০ বছর ধরে থাকা ওই চরে তিনটি সকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। সেগুলোর কোনও অস্তিত্ব নেই। আর বগুড়ায় বন্যার ধরন আলাদা ছিল। এখানে বন্যা মূলত যমুনা নদীর চর এলাকায়। মানুষের ব্যাপক দুর্ভোগ ছিল। তাঁদেরও বাড়িঘর ভেসে গেছে। গবাদি পশুসহ নদীতে তলিয়ে গেছে সর্বস্ব।

বগুড়ার বন্যাচিত্র। ছবি: মোস্তফা সবুজ

বন্যায় ফসলের কেমন ক্ষতি হয়েছে। এর কতোখানি প্রভাব পড়তে পারে গ্রামীন অর্থনীতিতে? সামগ্রিক অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?

গাইবান্ধা জেলা প্রশাসনের হিসাবে, উজানের ঢল আর বৃষ্টিতে গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ৫১টি ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অন্তত ৪২৪টি গ্রাম পানির নিচে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ছয় লাখ মানুষ। দিনের পর দিন ধরে ফসলি জমিতে পানি। এবারে বন্যার কারণে অন্তত ১৪ হাজার হেক্টর আবাদি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে রোপা-আউশ ধানের তিন হাজার, পাটের সাড়ে ছয় হাজার, সবজি পৌনে দুই হাজার ও পৌনে তিন হাজার হেক্টর আমনের বীজতলা ডুবেছে। এতে জেলার কৃষকদের অন্তত ৩০০ কোটি টাকার ওপরে ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় ব্যক্তিদের দাবি, গত ১০০ বছরের গাইবান্ধায় এত বড় বন্যা হয়নি। আমি গাইবান্ধা শহরের ঈদ মার্কেটে গিয়ে দেখেছি, সেখানে ক্রেতা নেই বললেই চলে। সাধারণ কৃষকরা বলছেন, এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে অন্তত ২ বছর লাগবে। বগুড়া বন্যায় ২৩ হাজার ৩০ হেক্টর পাট, আউশ, মরিচ, আখ, আমনের বীজতলা ও শাকসবজিসহ ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে বন্যার পানিতে পাট ভেসে গেছে ১০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির। এ পর্যন্ত ৬৬ হাজার ৬৩৫ কৃষক পরিবারের সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। গ্রামের মানুষের তো অন্য কোনা আয়ের উৎস নেই। কৃষির উপর দিয়ে চলে। একবার ফসল নষ্ট হলে, কলিজার উপর পাথর চাপা কষ্ট।

গাইবান্ধার বন্যাচিত্র। ছবি: মোস্তফা সবুজ

পরিস্থিতির সাপেক্ষে সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমের কী অবস্থা?

প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ অপ্রতুল। বগুড়ায় এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ ত্রাণ বরাদ্দ পাওয়া গেছে সে অনুযায়ী জনপ্রতি ৩ কেজি করে চাল এবং নগদ সাড়ে ৪ টাকা করে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে যমুনা ও বাঙ্গালী নদীর পানি বেড়ে বন্যার সৃষ্টি হয়। এ পর্যন্ত জেলার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা, ধুনট, গাবতলী ও শেরপুর উপজেলার ২৮৩ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সরকারি হিসাবে, জেলায় বন্যাদুর্গতের সংখ্যা ২ লাখ ৮৯ হাজার ৪৪৪ জন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৬৯ হাজার ৭৬৪টি। দুর্গতদের সহায়তার জন্য এ পর্যন্ত ত্রাণ বরাদ্দ মিলেছে ৯২২ দশমিক ৫ মেট্রিক টন চাল এবং নগদ ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা। সে হিসাবে মাথাপিছু বরাদ্দ মিলেছে ৩ দশমিক ১৮ কেজি চাল এবং নগদ ৪ টাকা ৫৭ পয়সা। ১৫ দিন ধরে দুর্ভোগ পোহালেও এখনো অনেকে ত্রাণ পাননি। গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলাসহ জেলায় ৫১ ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পাঁচ লাখ ৯৭ হাজার ৪৯৭ জন মানুষ পানিবন্দি। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ১ হাজার ২৩৫ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এই হিসেবে প্রতিজন ২ কেজি করে ত্রাণ পেয়েছে। গবাদিপশুর কোনো খাদ্য দেওয়া হয়নি গত ২৭ জুলাই পর্যন্ত। বগুড়ার চেয়ে গাইবান্ধায় বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ত্রাণের জন্য হাহাকার সর্বত্র।

স্থানীয় পর্যায়ে বিত্তশালীরা কিংবা কোনও সামাজিক সংগঠন কি বন্যার্তদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন?

স্থানীয় ছোট খাটো সামাজিক সংগঠন বিচ্ছিন্নভাবে ত্রাণ দিয়েছে। তবে এতো বড় পরিসরের বন্যায় এগুলো কিছু না। বিত্তশালী কারও এগিয়ে আসার খবর কম। তবে ভালো একটা বিষয় খেয়াল করার মতো সেটা হলো, বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ব্যানারে কিছু ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। এটা ভালো খবর। আশার খবর।

গাইবান্ধার বন্যাচিত্র: মানুষের পাশাপাশি গবাদি পশুও বিপন্নতায়, ছবি: মোস্তফা সবুজ

বন্যার্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সমাজের ভূমিকা কতোটুকু? মানুষের পারস্পরিকতা কতোটুকু? নাকি মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যার যার মতো করে পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা করছে?

সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি বিবেচনার সুযোগই সম্ভবত নেই বানভাসী মানুষের। কারণ গাইবান্ধায় বন্যায় কেউ কারও খোঁজ নেওয়ার সুযোগ নেই। ওখানে ধনী-গরীব সবাই বন্যায় আক্রান্ত। তবে নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার কারণে সবাই একসাথে রয়েছে। কিন্তু গাইবান্ধায় গত ১৭ জুলাই থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত সদরের বাদিয়াখালী, ফুলছড়ি উপজেলায় কোনো স্থানীয় নেতা কারও খোঁজ খবর নেয় নি। এটা স্থানীয়দের দাবি। আমিও খোঁজ নিয়ে দেখেছি, কেউ আসেনি। সেই অর্থে নিজেরাই বাঁচার চেষ্টা করে গেছেন ক্রমাগত। এখনও যাচ্ছেন।

বন্যা পরিস্থিতি কি সরকারবিরোধী ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে? পরিস্থিতির রাজনীতিকরণ হয়েছে কি? মানে বিরোধীরা একে কি সরকারবিরোধী তৎপরতায় কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে?

আজকের বাস্তবতায় বিরোধী দল তো অস্তিত্বহীন প্রায়। কারও সরকারবিরোধী অবস্থান আমার চোখে পড়েনি। মানুষ বন্যাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবেই নিয়েছে। তারা একে মোকাবিলার চেষ্টা করছে নিজেদের মতো করে। ত্রাণের জন্য হাহাকার রয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ চোখে পড়েনি।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment