শিশুর জন্য সাংবাদিকতা 

শিশু মনস্তত্ত্বে ‘সহিংসতা’

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 2 মিনিট

ঘটনা – ১

অনেকদিন পর আমার এমবিএ ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলো। এক বন্ধু তার বাসায় আমাদের অন্য বন্ধুদের দাওয়াত করেছিলো। আমার এই বন্ধুর দুই ছেলে। বড় ছেলেটার যখন প্রায় দেড় কি দুই বছর বয়স, তখন শেষ আমাদের দেখা হয়েছিলো। আর এখন তার ছোট ছেলেই হাঁটতে শিখেছে। বড় ছেলেটা কিছুটা চঞ্চল হলেও অনেক মিশুক। আমার সঙ্গে তার কিছুক্ষণের মধ্যেই খাতির হয়ে গেল। তো যখন আমি তার খেলার সাথী হয়ে গেলাম, খেয়াল করলাম, সে যা কিছুই বলছে বা করছে, একটু লড়াকু ভঙ্গিতে। যেমন আমার আরেক বন্ধু তার ছোট মেয়েকে নিয়ে এসেছিল, সেই পিচ্চিকে সে বারবার ফেলে দিচ্ছে বা কাঁদানোর চেষ্টা করছে। এমন কি নিজের ছোট ভাইকেও ফেলে দিচ্ছে, ধাক্কা দিচ্ছে বা খেলনা নিয়ে লুকিয়ে রাখছে, ভাই কাঁদলে সে খুব মজা পাচ্ছে। আর এই পুরোটা সময় আমার বন্ধু তাকে হালকা ধমক দিয়ে থামানোর চেষ্টা করছে। এরপর আমার সাথে সে যখন খেলা শুরু করলো, আমার হাতের আংটিটা খুলে নিয়ে খেলতে খেলতে এক পর্যায় মাটিতে বাড়ি দিতে শুরু করলো আর বললো এটা কি ভাঙ্গে না? এটা কিসের তৈরি ভেঙ্গে দেখি? তারপর তার নজর পড়লো আমার গলায় থাকা একটা হ্যান্ড পেইন্টেড লকেট এর উপর। খুলতে চেয়েও যখন পারলো না, বারবার কাছে আসছে, আমার গলায় নেড়েচেড়ে দেখছে আর বলছে এটা টান দিলে ছিঁড়ে যাবে, এই কাঠটা বাড়ি দিলে ভেঙ্গে যাবে। তো আমি তখন খেয়াল করলাম, শুধু মানা করে, ধমক দিয়ে বা বকা দিয়ে তাকে সাময়িক থামানো গেলেও বেশিক্ষণ তার মধ্যে ব্যাপারটা স্থায়ী হয় না। বরং সে আগের থেকেও আরও বেশি মাত্রায় কিছু একটা করার চেষ্টা করে। এরপর দেখলাম আমার বন্ধু তাকে খাওয়াতে বসলো, টিভিতে মোটুপাতলু ছেড়ে দিয়ে। ওই একটা সময় দেখা গেলো সে একদম অপলক তাকিয়ে থেকে কার্টুন দেখলো এবং তার মা তাকে কী খাওয়াচ্ছে সেটার দিকে তার খুব একটা খেয়াল ও নেই।

আজকাল বেশিরভাগ বাড়িতেই এটা একটা কমন ট্রেন্ড হয়ে গেছে, মা বাবারা বাচ্চাদের মোবাইলে নয়তো টিভিতে ডোরেমন, ওগি, মোটু পাতলু কার্টুন গুলো ছেড়ে দিয়ে রাখে আর বাচ্চারা চুপচাপ খেয়ে নেয়, নাহলে নাকি তাদের খাওয়ানো যায় না।

ঘটনা – ২

আমার বন্ধু তার ছেলেকে নিয়ে এক শুক্রবারে ঘুরতে বের হয়েছে। তো বাবা ছেলে শখ করে তাদের ঘোরাঘুরির একটা লাইভ ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করেছে যে, রাস্তা, যানবাহন, প্রকৃতি – ইত্যাদি নিয়ে ছেলে একটা ডকুমেন্টারি করছে এমন। বাচ্চার বয়স হবে আনুমানিক সাত অথবা আট। এই বয়সেই সে অনেক প্রফেশনাল টার্মস বলতে শিখেছে, শুনলেই বুঝা যাচ্ছে যে সে এই ধরনের ডকুমেন্টারি ভিডিও গুলা দেখে অভ্যস্ত। এত অল্প বয়সে এত স্মার্টলি ব্যপার গুলো সে বুঝতে শিখেছে, ব্যাপারটা আমাকে অনেক আনন্দ দিলো। কিন্তু ভিডিওটি করার একটা পর্যায়ে সে একটা নির্মাণাধীন ভবন দেখতে পায় এবং হঠাৎ করেই বলে উঠে যে সে একটা মিসাইল দিয়ে ভবনটা উড়িয়ে দিবে। তার বাবা যখন তাকে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে যে সে কেন এমনটা করতে চায়, তখন সে বলে ভবনটা দেখতে ভালো দেখায় না। তো তার বাবাও তাকে খেলার ছলে বলতে থাকে যে ঠিক আছে তাকে একটা মিসাইল কিনে দেওয়া হবে যেটা দিয়ে সে এই ভবন উড়িয়ে দিতে পারবে।

বুঝতেই পারছেন পাঠক, বাচ্চাদের মধ্যে ভায়োলেন্স থিংকিং অর্থাৎ ধ্বংসাত্মক মনমানসিকতা আজকাল অনেক ফ্রিকোয়েন্ট হয়ে গেছে।

ভিডিও কনটেন্ট দেখে দেখে শহুরে বাচ্চারা কথা বলা শিখতে দেরি করছে, এটা এখন প্রমাণিত। টেলিভিশনের আবির্ভাবের পরেই গণমাধ্যম নিয়ে মার্কিন গবেষকদের বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ হয়েছিল, শিশু মনস্তত্ত্বের ওপর টেলিভিশনে দেখা সহিংসতার প্রভাব বুলেট কিংবা সিরিঞ্জের সূচের মতোন। এসব নিয়ে আমরা কি ভাবব না?

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment