কাব্য গাহন দিনলিপি 

মোকাররম রানা-এর কবিতাগুচ্ছ

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 3 মিনিট

জুতা নিয়া


জুতা পরলে লাইট জ্বলত
প্যাক প্যাক কইরা শব্দ হইত
হাঁটতাম
লাইট জ্বলত
আর প্যাক প্যাক করে শব্দ হইত
আহারে
আমি নিজের পায়ের দিকে
নিজের জুতার দিকে মুগ্ধ চোখে
তাকায়া থাকতাম
আহারে
আমার প্যাক প্যাক শব্দ হওয়া
আহারে
আমার লাইট জ্বলা জুতা


জুতাগুলা পরে আমি কত জায়গায় গেলাম
কত কি দেখলাম
আর ছিঁড়ে গেলে সেলাই কইরা নিতাম
যখন আর সেলাই করা যাইত না
তখন ফালায়া দিলাম
আহারে
আহারে
আমার ছেঁড়া জুতারা


জুতা বদলাইতে বদলাইতে
বদলাইল পথঘাট
আহারে
আমি জুতা বদলাইতে বদলাইতে
বড় হইলাম
আহারে
আমার ছেঁড়া জুতারা

ডিসিশন

বাসের জানালা দিয়া দিগন্তে তাকায়া আছি
তোমার সাথে থাকাই হইল না কখনো
অথচ ছাইড়া যাওয়ার কথা ভাবতেসি!

নিরুদ্দেশের দেশে

মরার আগে একজন দেখে যাইতে পারে নাই
জোৎস্না প্লাবিত পৃথিবী।
কারণ তার চোখ বান্ধা ছিল।

সমুদ্র বিষয়ক


সন্ধ্যায় ছাইরঙা সমুদ্র সৈকতে
পায়ের পাতা ভিজায়া দাঁড়ায়া ছিল দুইটা মেয়ে
বালির উপরে হাঁইটা বেড়াতেসিল লাল কাঁকড়া
যেহেতু মানুষ কেমন সেইটা জানে সে
কাছাকাছি গেলেই ঢুইকা পড়তেসিল বালির গর্তে


সমুদ্রের মুখোমুখি দাঁড়ায়া মনে হইলো
মানুষের টাইমলাইনে কত রক্ত,যুদ্ধ,প্রেম ঝরে গেল
কত মৃতদেহ আর আবর্জনা গ্রহণ করল সমুদ্র
সেইসব মৃতদেহই ঢেউ হয়ে আসতেসে সৈকতের দিকে

বিবিধ শীতকাল


শীতকাল শেষ হইলে
বিবর্ণ পাহাড়ে পাহাড়ে
ফিইরা আইসো মেঘ


সিঁড়ির উপর বইসা থাকে দুইটা সাদা বিলাই
ছাদে উইঠা আলো দেখি শহরের
উঁচা উঁচা বিল্ডিংগুলারে আলো জ্বলা পাহাড় মনে হয়
মনে হয় আমি এক দূরবর্তী মানুষ
বাস করতেসি অচেনা দুনিয়ায়

বাইরে অন্ধকার।শৈত্যপ্রবাহ।আর,জানলার কাচে জমে থাকা শিশিরে কে যেন লিখে রাখসে-
মা,তোমাকে ভালবাসি।

বরফের শরীর নিয়ে ঘুরতেসি রোদে

ট্যুরিজম

ডিসেম্বরে
আমরা যাব পাহাড়ে
চান্দের গাড়িতে চড়ে খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যাব
পথে বিরতি নিব
আমাদের পাহারা দিয়া নিয়া যাবে আর্মি জীপ
যাইতে যাইতে পাহাড়ি বাচ্চাগুলার দিকে চকোলেট ছুড়ে দিব
উঠব লুসাই কটেজে
রাতে মহুয়া খেয়ে ভোরে কংলাকে সূর্যোদয় দেখতে যাব
ফেরার পথে আমাদের ভাড়া করা চান্দের গাড়ির পাদানিতে উঠতে দিব কয়েকটা গরিব পাহাড়িরে
পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী এরা
এদের খালি পা,তীব্র শীতেও গায়ে ছেড়া সোয়েটার
কটেজে ফিরে আমরা পাহাড়ের দারিদ্র্ নিয়া আলাপ করব
হায় আল্লাহ!
আমরা ট্যুরে না আসলে এরা কী পরে, কী করে,কী খেয়ে বাঁচত?

মিছিল

এই মনোটোনাস শহরে যখন মিছিল শুরু হয়,তখন আর কোথাও যাইতে ইচ্ছা করে না আমার।আমি মিছিলের ভিতরে ঢুইকা মিছিল করি। মিছিলের বাইরে দাঁড়ায়া মিছিল দেখি।
মিছিল শুরু হয়, মিছিল শেষ হয়। মোড়ে মোড়ে দাঁড়ায়া থাকে সতর্ক সান্ত্রী।শহরের সবখানে বিরাজিত হইতে থাকে অভূতপূর্ব শান্তিশৃঙ্খলা।যেন মিছিল বলে কিছু নাই।ছিল না কোথাও।
আমাদের মনোটোনাস শহর আবারও মনোটোনাস হইতে থাকে।
আর নাগরিকেরা মিছিল করার স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুমায়া পড়ে।

স্বপ্নজাত অবিচ্ছেদ


যেন তুমি আর আমি আমাদের স্বপ্নের ভিতরেই একসাথে থাকি।ক্ষুধা তৃষ্ণা বেঁচে থাকার দায় আমাদের ঘুম ভাঙায় প্রতিদিন।তারপর প্রতি রাতে পরস্পরের থেকে দূরে আমাদের পৃথক বিছানায় শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করি ঘুমের জন্য।স্বপ্নের জন্য।
একমাত্র স্বপ্নেই কখনো বিচ্ছেদ ঘটবে না আমাদের


খেলতে খেলতে মানুষ নিজেই কখন খেলনা হয়ে পড়ে


যেন গাছের পাতা জইমা থাকা শিশির
দেখতে পারি বুঝতে পারি
তবু
আমি তোমার নিরবতা ছুঁইতে পারি না


বিপন্ননেস অন্ধকার স্বপ্ন অন্ধকার অপরিচিত লাগতে থাকা পৃথিবী যেন আমি এই পৃথিবীর কেউ নই এখানে আর ভাল লাগে না আমার এইখানে আহত পুষ্পের ছিন্নভিন্ন মানুষের আর্তনাদের ভিতরে উল্লাস করে বোমারু বিমান স্বপ্নের সব নদী হারায়া গেসে হারায়া গেসে বন্ধু পাখিরা ভালবাসাহীন টেনশনের শহর বিপন্নতায় ভুগতে থাকা দিন আমি কই আছি আমি বুঝতে পারি না যেন অন্যকোথাও চলে যাওয়া গেলে ভাল হইত তোমার কাছে যাব না তুমি আমারে দেখাও শীতল অন্ধকার আমার শীতকাল ভাল লাগে না আর শীত লাগলে ঘুমায়া পড়তে ইচ্ছা করে কুত্তার বাচ্চার মত গনগনে আগুনের ধারে


জানলা খুলতেই ঘরে ঢুইকা পড়লো পাশের বাড়ির ছাদ,শুকাইতে দেয়া রঙিন কাঁথা,ধূসর আকাশ

কিছুই হওয়ার নাই আমার
তবুও কিছু হইতে চাইতেসি
তোমার কথা ভাইবা ভাইবা
অহেতুক প্যাড়া খাইতেসি

তেল শা বাবার মাজার


গাঞ্জা তোমারে মিস করলাম
গাঞ্জা তোমার কথা সারাদিন ভাবলাম


সব রাস্তাই
শেষমেশ
ভুল গন্তব্যে নিয়া যায়


জন্ম নেয়ার আগে তুমি কিংবা আমি
ছিলাম এক দলছুট নিঃসঙ্গ জোনাকি


বর্তমান এত বেশি শূন্যতায় ভরা
স্মৃতি আর স্বপ্ন ছাড়া কিছুই থাকে না

দুঃখী শহর


শুধু আমি বা আমরা না,শহর নিজেও পালাইতে চায় এমন শহর থিকা

দুনিয়া থেকে হারায়া যাইতেসে তুরাগ নামের একটি নদী
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্বপ্নের ভিতরে মইরা যায় জলজ পৃথিবী

খেলার মাঠে দেয়াল উঠতেসে,মেলা বসতেসে আর ফেসবুকের নিউজফিড ভাইসা যাইতেসে টিভি ক্রিকেটের গুয়ের গন্ধে

নাম নাই


তুমি একটা প্রজাপতি অথবা ফড়িং
উড়তে উড়তে আমার মাথার ভিতরে ঢুকে গেসো


মগজ আমারই তবে দখল অন্য কারো
ছেড়ে চলে গেলে
একা হয়ে যাই আরো


গতিময়তার ভিতরে টের পাওয়া যায় কি, ভিন্ন ভিন্ন বাহনে আমরা একই গন্তব্যের যাত্রী?

দুপুরের রোদে দানা খুঁটে খাইতেসিল দুইটা কবুতর
ছোটবেলায় হারানো মারবেল দেখলাম তোমার চোখের ভিতর


অইটা ছিল এক বিষণ্ণ হেমন্তকাল
নদীর পাড়ে ঘাসের উপর শুয়ে শুয়ে ভাবতেসিলাম, তোমারে নদী দেখতে আসার কথা বলবো
নদী দেখার আমন্ত্রণে তুমি রিপ্লাই না দিলে আইডি ডিয়েক্টিভ কইরা নিরুদ্দেশ হয়া যাবো

মা ও তার ছানারা

পাঁচটা মুরগির বাচ্চা
টিটি
একটা মোরগ
উদ্ভ্রান্ত
একটা মেয়ে
সবুজ ধান ক্ষেতের ভিতর দিয়া
হাইটা গেল

ক্যামনে থাকে আমার মা
তার ছানারা যখন কাছে থাকে না?

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment