দিনলিপি 

মেজর সিনহা, অ্যানকাউন্টার ও লিঞ্চিং এবং আস্থাহীনতা প্রসঙ্গ

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 2 মিনিট

টেকনাফের ওসি প্রদীপ আর এস আই লিয়াকতের করা খুনের সংখ্যা শুনে আশ্চর্য হচ্ছি। বুঝতে পারছি না কিসের মধ্যে বাস করছি আমরা! দেশ কি ওয়েস্টার্ন গল্পের বুনো পশ্চিমে পরিণত হয়েছে! দেশে কি বিচার ব্যবস্থা ফেইল করেছে! না হলে এতগুলো মানুষ কীভাবে ক্রসফায়ারের নামে এমন নির্জলা খুনের শিকার হয়। অপরাধ বিজ্ঞান বলে শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এমন খুনের ঘটনা উল্টো অপরাধীদের উৎসাহিত করে। একধরণের বিকৃত অ্যাডভেঞ্চারিজমের জন্ম দেয়। বন্দুকই ফায়সালা হয়ে দাঁড়ায়।

মেজর সিনহার হত্যাকান্ড বিকৃত অ্যাডভেঞ্চারিজমের এই দৃশ্যচিত্রকেই সামনে এনেছে। ক্যানিবাল একটা ভ্রস্ট সিস্টেমের সত্যতাকে প্রকাশ করেছে। কক্সবাজারে নরভোজি এই সিস্টেম গড়ে উঠেছে মেজর সিনহা হত্যা তা প্রমান করেছে। এতদিন সাধারণ মানুষের মৃত্যুতে যা চোখের সামনে আসেনি, মেজর সিনহার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সামনে এসেছে। একটা ছোট জেলায় ক্রসফায়ারের নামে হত্যাকাণ্ডের এই সংখ্যাকে শুধু আশঙ্কাজনক বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য এসব খুনের প্রতিটার শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

ওয়েস্টার্ন যারা পড়েছেন, তারা জানেন যে সব জায়গায় আইন ব্যর্থ হয়, সেখানে আউট-ল’দের উত্থান ঘটে। তখন বাধ্য হয়েই ফায়সালা দাঁড়ায় বন্দুকের গুলিতে। মব জাস্টিসের হাতেই পড়ে বিচারের ভার। আমাদেরও কি তাই হতে চলেছে। এই যে দেশে গণপিটুনির ঘটনা, এগুলো সব মব জাস্টিসের ধারণা উদ্ভুত। যখন শৃঙ্খলা বাহিনী ক্রসফায়ারের নামে তাৎক্ষণিক ফায়সালা বেছে নেয়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাৎক্ষণিক ফায়সালার ধারণাটি পোক্ত হয়ে যায়। শৃঙ্খলা বাহিনী গুলিতে মারে, পাবলিক পিটিয়ে মারে। কথা হলো গুলি এবং গণপিটুনিই যদি বিচারিক প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায় তাহলে বিচার ব্যবস্থার জায়গাটা কোথায়? এমন প্রশ্ন সঙ্গতই এসে যায়।

মানুষের মধ্যে কেনো এমন আস্থাহীনতা তৈরি হলো যে অপরাধীরা শাস্তি পাবে না? কেনো অনেকেই ক্রসফায়ারকে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষে স্বাগত জানান? ক্রসফায়ার কিংবা গণপিটুনির মতন লিঞ্চিংকে থামানোর জন্য এগুলো জানা জরুরি। ‘অ্যানকাউন্টার’, আমাদের এখানে যা ‘ক্রসফায়ার’ নামে চলে, তা বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতেও ঘটে। সেখানকার মানুষ যা অনেক ক্ষেত্রেই মেনে নেয়। তারা বিশ্বাস করে, সরকারি বাহিনী বাধ্য হয়েই এটা করেছে। বিচার ব্যবস্থার প্রতি এমন আস্থা এবং বিশ্বাসের কারণেই তারা তা মেনে নেয়। তারা জানে ‘অ্যানকাউন্টার’ যদি ইচ্ছাকৃত হয় তবে সরকারি বাহিনীর লোকজনও ছাড় পাবে না। তাদের খুনের দায়ে অভিযুক্ত এবং শাস্তি পেতে হবে। এমন আস্থা ও বিশ্বাসই মব জাস্টিস ও লিঞ্চিং ঠেকাতে পারে।

বিচার হবে না, মানুষের মধ্যে এমন আস্থাহীনতার সুযোগে কিছু মানুষ, সে সরকারি হোক কিংবা জনতার মধ্যে হোক, অপরাধী হয়ে উঠে, উঠেছে। সাথে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক কদর্যতা। তারা এই আস্থাহীনতাকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করছে। তা না হলে কক্সবাজারে ক্রসফায়ারের নামে এতগুলো মানুষকে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটতো না। বারবার বলি, অপরাধীরা হচ্ছে প্রডাক্ট, তাদের মেরে শেষ করা যাবে না, যতক্ষণ না প্রডাক্ট তৈরির মেশিন ধ্বংস করা না যাবে। ইয়াবা আসার রাস্তা বন্ধ না হলে, ইয়াবা ব্যবসায়ী থাকবেই। রাবণের দশমাথার মতন একটা কাটলে আরেকটা গজাবে। কাঁচা টাকার নেশা সবারই আছে, এই যে ‘লিঞ্চিং’ ধরো এবং মেরে ফেলো এর পেছনেও রয়েছে সেই টাকার নেশাই। সুতরাং যারা এমন ‘লিঞ্চিং’ এর সাথে জড়িত তাদের সাথে মাদক ব্যবসায়ীদের মানসিক চিন্তার খুব একটা ফারাক নেই। দুপক্ষেরই কমন নেশা হলো অর্থ উপার্জন। আর সেটা এমন ভয়ংকর পথে হলেও। আর টাকার সাথে ক্ষমতার নিবিড় যোগাযোগের কথা তো সবার জানা। আর ক্ষমতার সাথে রাজনীতির যোগসূত্রের।

নিহত মেজর সিনহার মাকে প্রধানমন্ত্রী ফোন দিয়েছেন, সমবেদনা জানিয়েছেন। এটা খুব ভালো একটা খবর। আশার খবর। শুধু মেজর সিনহা নয় এমন ঘটনার ক্ষেত্রে প্রতিটা মা-বাবার, পরিবারের রাষ্ট্রের সমবেদনা পাবার প্রয়োজন ও অধিকার রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এমন ফোন মানুষকে সাহস জোগাবে, ভরসা জোগাবে।

পুনশ্চ: রাষ্ট্রযন্ত্র এমন একটি চলমান ব্যবস্থা যার ব্যর্থতা তাকেই খুঁজে বের করতে হয়। বিচার ব্যবস্থাও সেই রাষ্ট্রযন্ত্র ও ব্যবস্থারই অংশ।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment