দিনলিপি 

ভাষিক সহিংসতা এবং নারীর দৈনন্দিন বাস্তব

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 7 মিনিট

‘ক্ষমতা মিডিয়া আর মানুষ’ নামে শ্রাবণ প্রকাশন থেকে ২০১২ সালে প্রকাশিত আমার বইতে নারীর উপর ভাষিক সহিংসতা: প্রান্তে তার পাল্টা ভাষা শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিলো। সেই প্রবন্ধের একটা সংক্ষিপ্ত রূপ দিনলিপির পাঠকের সামনে হাজির করা হলো ঠিক তখন; যখন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের শাড়ি সংক্রান্ত একটি লেখাকে ঘিরে ইন্টারনেট দুনিয়ার বাসিন্দাদের একাংশের মধ্যে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিরাজমান এই বাস্তবতার সঙ্গে এই লেখাটা মিলিয়ে পড়ার সুযোগ আছে; এমন ভাবনা থেকে এই পুনঃপ্রকাশ।

পটভূমি
ভাষাকে কেন্দ্র বিবেচনা করে, এর সাথে ভাবনা-প্রতীক-অর্থ-ক্ষমতা-জ্ঞান-আধিপত্যের সম্পর্কসূত্রকে মিলিয়ে পড়তে গিয়ে, এই লেখার পটভূমি তৈরী হয়। ভাষা-সহযোগে নির্মিত আমাদের প্রতিদিনকার বাস্তব, আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতায় প্রতিদিনকার ভাষিক বিনিময় আর সেই ভাষিক বিনিময়ের মাধ্যমে উৎপাদিত চিন্তাধারা ও তৎপরতা আর ক্ষমতাশক্তির অপরাপর ধারাগুলোর সাথে এই জ্ঞানের কিংবা চিন্তাধারার সম্পর্কসূত্রের পাঠ নিতে গিয়ে আারও অনেক কিছুর সাথে এটা দেখা হয়ে যায় যে, সমাজে প্রবহমান পুঁজি-প্রেষিত-পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার যে আধিপত্য, ভাষা খোদ সেই আধিপত্যের জমিনকে পোক্ত করতে থাকে তার নির্মিত অর্থ কিংবা নির্মিত জ্ঞানের মাধ্যমে। অর্থাৎ খোদ ভাষাই হয়ে দাঁড়ায় পুরুষতন্ত্রের দাস, তার বৃত্তে বৃত্তাবদ্ধ। ভাবনা যেহেতু ভাষাকে প্রভাবিত করে, আর ভাষা যেহেতু জ্ঞান তৈরির প্রধান হাতিয়ার এবং সেই জ্ঞান মানেই যখন ক্ষমতা তখন পুঁজিবাদী-পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা-কাঠামোতে ভাষা পুরুষতান্ত্রিক জ্ঞানেরই উৎপাদন ঘটায়। এই লেখায় আমরা প্রথমে খোদ ভাষার অভ্যন্তরে কী করে একটা পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্ব বাস করে আর কীভাবে তা নারীর উপর আরোপিত হয় তা আলাপ করবো ২/৪টা উদাহরণ-সমেত। সেই আলাপে ভাষার মাধ্যমে উৎপাদিত জ্ঞানে নারীর প্রতি কী দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন ঘটছে সেটাকে আমরা চিনতে চেষ্টা করবো এবং পুরুষতান্ত্রিক বাস্তবতাকে চলমান রাখতে খোদ ভাষাই কিভাবে একটা মুখ্য শক্তি হয়ে ওঠে তা দেখব।


বেশ্যা-পতিতা-ছিনাল-খানকি: নিত্য স্ত্রী-বাচক শব্দ!

বেশ্যা শব্দটি এসেছে বৈশ্য শব্দ থেকে। বর্ণপ্রথার কালে হিন্দু ব্যবসায়ী শ্রেণীকে বলা হতো বৈশ্য। সেখান থেকে বিকোনো অর্থে এসেছে বাংলা বেশ্যা শব্দটি। কালের পরিক্রমায় শব্দটির একক-একমুখী অর্থ নির্মিত হয়েছে। শরীর বিক্রি করা মেয়েদের উপাধি হয়েছে বেশ্যা শব্দটি। সে যাই হোক, শুধু শরীর বিকোলেই না, সমাজে সাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করলে, পুরুষতান্ত্রিক অবদমনকে মেনে না নিলে, রাত-বিরোতে ঘোরাফেরা করলেও বেশ্যা বলার চল আছে। বেশ্যা একটি স্ত্রীবাচক শব্দ এবং এর কোনো পুরুষবাচক সমার্থক শব্দ নেই। তারমানে কি এই যে, শরীরী শুদ্ধতা শুধুমাত্র নারীদের বিষয়? পুরুষের শরীর শুদ্ধ হতে হয় না? পুরুষের শরীর বিক্রয়যোগ্য কোনো পণ্য হতে পারে না? একই রকমের শব্দ ছিনাল/ছিনার। অভিধানে এগুলোর অর্থ করা আছে পতিতা, ভ্রষ্টা, কুলটা, ব্যাভিচারিণী, মিথ্যা প্রণয় মান অভিনয় ইত্যাদিতে কলাকুশলি নারী। খানকি শব্দের আভিধানিক অর্থ বারাঙ্গণা, বেশ্যা। পতিতা শব্দের অর্থ করা আছে বেশ্যা, বনিতা, বারবনিতা। এই শব্দগুলোর কোনোটিরই কোনো পুরুষবাচক সমার্থক শব্দ নেই।

ভাত দেয়া ভাতার আর পুঁজিতান্ত্রিক দাস নারী
ভাতার শব্দের সরাসরি অর্থ করা আছে স্বামী, পতি এই দুটি শব্দ। এছাড়া ভরণ করায় যে, ভর্ত বা ভাত দেয় যে সেও ভাতার। আমাদের প্রমিত বাংলা ব্যবহারকারী মধ্যবিত্তের বাঙালী সংস্কৃতিতে ভাতার শব্দটির তেমন প্রচলন না থাকলেও নিম্নবিত্তের যাপন ক্রিয়ার সাথে ভাতার শব্দটির এখনও ওতপ্রোত বসবাস। মধ্যবিত্ত নারীর ভাত কিংবা ভরণ-পোষণ এই যুগে এসে আর আগের মত করে পতি কিংবা স্বামীর প্রতি নির্ভরশীল নেই। অনেকেই এখন কর্মক্ষেত্রে যায় এবং ইচ্ছে করলেই পুজিতন্ত্রের আওতায় স্বনির্ভর অর্থনৈতিক জীবন যাপনে সক্ষম। কিন্তু নিম্নবিত্তের নারীরা ঘরেই থাকেন বিশেষত। প্রতিদিন গৃহস্থালী নামের শব্দের মধ্যে একটু একটু করে হারিয়ে যেতে থাকে তার শ্রমিকতার ইতিহাস, হারিয়ে যেতে থাকে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় তার বিনিয়োজিত শ্রমের মূল্য পাবার প্রশ্ন। স্বয়ং কার্ল মার্কসও টের পাননা। তাই পুরুষ এখনও নিম্নবিত্তের ভাতার। সবমিলিয়ে পুরুষ-পুজি আর পুরুষ-স্বামীর মিলিত প্রয়াসে ভাতার শব্দটির অভিধান স্বীকৃত হয়। নিম্নবিত্তের যে নারীরা গৃহস্থালীর বাইরে ইট ভাঙেন, গার্মেন্টস এ কাজ করেন, অন্যের বাড়িতে দাসীর কাজ করেন, হায় তবু পুরুষ তাঁদেরও ভাতার।

সতীত্বের চিহ্ন: সতীত্বের পুরুষ-ভাষা
প্রথমে অভিধান থেকে কিছু শব্দের অর্থ আমরা জেনে নিতে পারি। বাংলা একাডেমীর অভিধানে এভাবে অর্থগুলো করা; সতী: সাধ্বী, পবিত্রতা, স্বামী ভিন্ন অন্য পুরুষে আসক্ত নয় এমন, হিন্দু পুরাণের দক্ষ কন্যা, শিবানী, স্বামীর মৃত্যুতে সহগামিনি স্ত্রী। সতিচ্ছদ: কুমারী ঝিল্লী, যোনীমুখের পাতলা পর্দা। সতীত্ব: যৌন পবিত্রতা, সতী স্ত্রীর ধর্ম। সতী ধর্ম: স্বামীর প্রতি নারীর একনিষ্ঠতা বা যৌন পবিত্রতা। সতীপনা/ সতীগিরি: সতীত্বের ভুয়া গর্ব বা মিথ্যা ভড়ং। সতীত্ব তাহলে শুধুই নারীর বিষয়। সতীত্ব হলো যৌন পবিত্রতা, সোজা বাংলায় বললে একগামীতা, যা কেবল নারীর জন্যই অভিধানসিদ্ধ। কেননা পুরুষের জন্য সতীত্বের সমার্থক শব্দ আমি অন্তত ডিকশনারীতে খুঁজে পাইনি।


চুত, চুতমারানি, চুদ, চুদা: নারীর উপর ভাষিক-সহিংসতা
অভিধানে চুত শব্দের অর্থ করা আছে যোনি। চুতমারারনি: যত্রতত্র যৌনসঙ্গম করে এমন। চুদ: যৌনসঙ্গম। পাঠক খেয়াল করে দেখুন, চুদ শব্দের সমার্থক হিসেবে যৌনসঙ্গমের কথা বলা থাকলেও চুদা শব্দের সাথে একেবারে কর্তাসত্তা হিসেবে পুরুষের ভাবমূর্তি ভেসে ওঠে। সেই একমাত্র সক্রিয়ক হয়ে দাঁড়ায়। কোনো মেয়ে বলেনা যে, চুদব। কেন বলে না? কেননা চুদ শব্দের আভিধানিক অর্থ যৌনসঙ্গম হলেও অর্থের জগতে এখানে পুরুষেরই একক আধিপত্য। চুত শব্দের অর্থ যোনি। যৌন শব্দটিও যোনী থেকেই এসেছে। যোনিগত, যোনিজাত যা তাই যৌন। কিন্তু যৌনতা শুধুই নারীর যোনীতে থাকে, পুরুষ তাতে সাড়া দেয়, তারমানে কী দাঁড়ায়? আবারো নারীর অক্রিয় ভূমিকা। তার প্যাসিভ রোল। যৌনতায় তাঁর নিস্ক্রিয়তা। [বলে রাখাটা অত্যন্ত সঙ্গত হবে যে, ভারতের একনিষ্ঠ জ্ঞানসাধক, কলিম খান, যোনী-যৌনতার ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ বের করেছেন যা যৌন শব্দের একক অর্থকে অস্বীকার করেছে। সে অর্থে তিনি ভাষায় পুরুষাধিপত্যের বিরুদ্ধে আমাদের সাথে লড়াইয়ে আছেন।] এমনি করে ‘গোয়া মারব’ ‘চুদব’ এমনকী ‘খাব’ শব্দগুলির মতো অনেক অনেক শব্দ দিয়ে এই ভাষিক সহিংসতা জারি রাখা হয় যেখানে নারী বিবেচিত হয় পুরুষের যৌনভাবনা কিংবা যৌনক্রিয়ার অনুষঙ্গ। যৌনতায় নারীর সক্রিয়তা থেকে তাকে বিযুক্ত রাখা হয়। শব্দগুলি নারীর উপর যৌনপীড়নের প্রতীকে পরিণত হয়। যৌনতা হয়ে দাঁড়ায় পুরুষের সক্রিয়তার এলাকা, নারী তাতে শুধুই নিপীড়িত, শুধুই অনুষঙ্গ।


ধর্ষণ: নারীর উপর শারীরিক সহিংসতা
প্রথমে অভিধান থেকে অর্থ জেনে নিই। ধর্ষণ শব্দের অর্থ করা আছে পীড়ন, অত্যাচার, নির্যাতন। বলাৎকার, বলপূর্বক গ্রহণ। ধর্ষণী নামে একটা শব্দ পাওয়া যাচ্ছে যার অর্থ অসতী নারী। ধর্ষিত শব্দের অর্থ করা আছে উৎপীড়িত, অত্যাচারীত, পরাভূত, পরাজিত, অপমানিত, তিরস্কৃত আর ধর্ষিতা শব্দের অর্থ বলাৎকৃতা, বলপূর্বক সতীস্ব নষ্ট করা হয়েছে এমন। আবারও সেই একইভাবে দেখুন পাঠক, ধর্ষণ শব্দের অর্থ হিসেবে পীড়ন অত্যাচার নির্যাতন ও বলপূর্বক গ্রহণের কথা বলা থাকলেও ধর্ষণী নামের একটি শব্দ পাওয়া যাচ্ছে যার মানে করা আছে অসতী নারী। তারমানে আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক ভাষার জগতে কেউ ধর্ষণের শিকার হলে কাউকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হলে তার সতীত্ব চলে যায়। ওদিকে আরেকটি শব্দ পেলাম ধর্ষণীয় যার অর্থ ধর্ষণযোগ্য, ধর্ষণসাধ্য, নির্যাতন বা দলন করতে পারা যায় এমন। তারমানে ধর্ষণযোগ্য কিংবা ধর্ষণসাধ্য বলে কোনোকিছুর অস্তিত্ব যদি থাকে তাহলে আমাদের এটা মেনে নিতে হয় যে, খোদ অভিধান ধর্ষণকে অনুমোদন করে! ধর্ষণযোগ্য কিংবা ধর্ষণসাধ্য কোনোকিছুর অস্তিত্ব রেখে। হায়রে সতীত্ব! হায়! এখানে ধর্ষিত শব্দের অর্থ হিসেবে কোথাও সতীত্বের প্রশ্নটি না তোলা হলেও ধর্ষিতা বলতে সেই মেয়েটির কথাই বলা হয়েছে যার সতীত্ব হরণ করা হয়েছে বলপূর্বক। তারমানে নারীর সতীত্ব তার নিজের কাছে না, সতীত্ব বন্দী পুরুষতান্তিক ক্ষমতার সাথে। জোর করেও কাউকে ধর্ষণ করবে পুরুষ আর নাম দেবে অসতী। নারীকে গ্রহণ করতে হবে সেই উপাধি।


লিঙ্গান্তরে অর্থান্তর: সতী, নটী, মাগী
লিঙ্গান্তরে অর্থেরও বদল ঘটেছে কিছু কিছু শব্দে। এই যেমন সতীর পুরুষবাচক সমার্থক শব্দ সৎ হলেও সৎ শব্দের আভিধানিক অর্থের সাথে শরীরগত সততা, তথা সোজা বাংলায় বদলে একগামীতার কোনো সম্পর্ক নেই। তেমনি করে নটী শব্দের অর্থ হিসেবে নর্তকী, নৃত্য যে নারীর উপজীীবিকা, অভিনেত্রী এইসব শব্দের কথা বলা আছে। কিন্তু নট শব্দটি অভিধানে থাকলেও বাইরে প্রচলন নেই। কিন্তু বেশ্যা, শরীরী প্রণয়ী নারী অর্থে নটী শব্দের প্রচলন আছে বিশেষত নিম্নশ্রেণীর মানুষের মধ্যে। মাগী শব্দের অর্থ করা আছে: প্রাপ্ত বয়স্কা, স্ত্রীলোক, সাবালিকা নারী, বেশ্যা, গণিকা। কিন্তু মরদ মানে: বেটাছেলে, যে ব্যাক্তির পুরুষোচিত গুণ রয়েছে, শক্তিশালী ব্যক্তি, বীরপুরুষ, যুবক, পতি, স্বামী। পাঠক খেয়াল করে দেখুন মাগী শব্দের সাথে বেশ্যা গণিকা শব্দের সমার্থ করা থাকলেও এর পুরুষবাচক সমার্থক শব্দ মরদ-এর সাথে শারীরিক বেচা-কেনার কোনো সম্পর্ক নেই। তারমানে, ছেনাল-বেশ্যা শব্দের মতো এই শব্দগুলির অভ্যন্তরেও জারি আছে একই সেই ধারণা যে, একগামীতা, শারীরিক শুদ্ধতা, সতীত্ব এইসব শুধুই নারীর বিষয়। মানে নারী একগামী থাকবে, অনেকের সাথে শারীরিক সম্পর্ক থাকবে না, পুরুষ তাকে এই পুরুষতান্ত্রিক-পুঁজিবাদী মালিকানার যুগে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে ইচ্ছেমতোন ব্যবহার করবে, ভোগ করবে কিনে নেয়া সম্পত্তির মতো।


ব্যক্তিমালিকানার লৈঙ্গিক অভিপ্রকাশ: আমারই পুর্বপুরুষ!
পুজিতান্ত্রিক-ব্যক্তিসম্পত্তির যুগে পূর্বপুরুষ নামের একটি শব্দ থাকলেও পূর্বনারী বলে অভিধানে কোনো শব্দ নেই। পূর্বপুরুষ শব্দটির আভিধানিক অর্থ বংশের পিতৃপিতামহাদি পূর্বগামী ব্যক্তিগণ। ওদিকে পুরুষানুক্রম নামে একটি শব্দ পাওয়া যাচ্ছে অভিধানে যার অর্থ বংশপরম্পরা। তারমানে আমাদের পুঁজিতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত মালিকানার উপস্থিতি যে সম্পদের ধারণা জারি রেখেছে সেখানে নারীও পুরুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয় এবং ভঙ্করভাবে দৃশ্যমান হয় এই সত্য যে, ১০ মাস নিজের শরীরের মধ্যে আরেকটি শরীরকে একটু একটু করে বেড়ে তোলা, তাঁর অধিকাংশ দায়দায়িত্ব পালন করা, প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় তার সাথে প্রথম অনুভূতির বিনিময় যে শিশুর, সে শিশুর পূর্বনারী নেই, সে শিশুর নেই কেনো নারীক্রম! সে শিশু কেবলই পুরুষের পরিচয়ে পরিচিত হয়। পাঠক, এই পূর্বপুরুষ আমাদের অস্বীকার প্রক্রিয়ার এক নাম। অবদমনের এক নাম। নারীর উপর পুঁজিবাদী-পুরুষতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার যে আধিপত্য; এই পূর্বপুরুষ শব্দটি তারই প্রতিমা। একগামী নারীর জন্য, বংশপরিচয়ের নিমিত্তে, পুরুষের আইডেনটিটি বজায় রাখতেই এই প্রক্রিয়া। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা, নারীর উপর পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য আর নারীর জন্য কাল-নির্ধারিত একগামীতর ধারণা মিলেমিশে তৈরী করে পূর্বপুরুষ।


শালা কখন গালি? কখন বন্ধু ‘মামা’?
শালা শব্দের আভিধানিক অর্থ পাচ্ছি ২টি। স্ত্রীর ভাই, গালিবিশেষ। স্ত্রীর ভাই আর গালি একই শব্দে প্রকাশিত। সামাজিক অর্থ নির্মাণ প্রক্রিয়ায় একেবারে তুচ্ছার্থে গালি অর্থে এই শালা শব্দটির ভ্যবহার এবং স্ত্রীর সাথে তাঁর সম্পর্কষূত্র পুরাষাধিপত্যের ভয়ঙ্কর নমুনা। স্ত্রীর ভাই, শালা, একেবারে তুচ্ছ, হাস্যরসের উপাধান ইত্যাদি। এমনি করে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশের মধ্যে বন্ধুদের পরস্পরকে আর শালা নয়, মামা নামে ডাকা হচ্ছে। শব্দটি কিন্তু শালার বিপরীতে প্রতিস্থাপিত হয়েছে এবং এখানেও ব্যাপারটা হলো বাপের শালা বলে উপহাস করা। আমরা টেরই পাই না, এভাবে গোপনে কখন পুরুষাধিপত্যশীল শব্দ আমাদের মাঝে ঢুকে যায়।


মেয়েলি মানে কী? পুরুষালী মানে কী?
অভিধানে মেয়েলি আর পুরুষালী শব্দের অর্থের মধ্যে দিয়ে নারী ও পুরুষের প্রকৃতিগত ভিন্নতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের সামাজিক অর্থ নির্মাণে মেয়েলি শব্দটি দিয়ে মেয়েদের আবেগী, যুক্তিহীন, কোমলপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য জানান দেয়া হয়, অপরদিকে পুরুষালি শব্দটি দিয়ে পৌরুষ, শক্তি, ক্ষমতা প্রকাশিত হয়। এখানেই ভাষার রাজনীতি। তারমানে মেয়েরা আবেগ নিয়ে থাকবে, কোমল হবে, কোনো উল্টোপাল্টা করবে না, পুরুষত্বসম্পন্ন পুরুষের অধীনস্ত থাকবে। এই হলো সোজা বাংলা কথা। তাই আমরা যখন দেখি কোনো ছেলে কোমল আচরণ করছে কিংবা তেমন কিছু করছে তখন তাঁর স্ব^ভাবকে মেয়েলি স্বভাব বলে উপহাস করা হয়। আবার অপরদিকে মেয়েরা যদি বাইরে চলাফেরা করে, তর্ক করে, জোড়ে হাঁটে, সোজা কথায় পুরুষতান্ত্রিকতাকে অস্বীকার করে তখন তার স্বভাবকে পুরুষালি স্বভাব বলে গালি দেয়া হয়।


নপুংসক: পুরুষেরই গালি
নপুংসক শব্দটিও পুরুষাধিপত্যেরই অর্থ বহন করে। নপুংসক শব্দটির মানে করা আছে ক্লীব, হিজড়া, স্ত্রীও নয় পুরুষও নয় এমন মানুষ, ছিন্নমুষ্ক, খোজা, পুরুষত্বহীন, বীর্যহীন, কাপুরুষ, পৌরুষের অভাব, ব্যক্তিত্বহীন। অর্থাৎ দেখুন পাঠক, পুরুষত্বহীনতা, বীর্যহীনতা আর যৌনসক্ষমতা থাকা না থাকা একই শব্দ দিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। পৌরুষের অভাব কিংবা পুরুষত্বহীন– এই দুটি শব্দেও যখন নপুংসক-এর সমার্থক বিবেচনা করা হয়, তখন এই চিহ্নায়ন প্রক্রিয়া আমাদের বুঝতে শেখায়, আসলে মনুষ্য প্রজাতির সমগ্র থেকে সমস্ত পুরুষ আলাদা এই অর্থে যে তার যৌনক্ষমতা নারী-হিজড়া সবার থেকে আলাদা, অনন্য। এই্ শ্রেষ্ঠত্বের বোধ এই অধিপতি মন আর অধিপতি পুরুষভাষা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।


গৃহিণীপনা: ভাষা যখন গৃহকর্মে নারীর একক দায়িত্বকে প্রশ্নাতীত করে
গৃহিণীপনা শব্দটির আভিধানিক অর্থের সাথে পুরুষের কোনো যোগাযোগ নেই। আবার গৃহস্থালীর কাজে নিয়োজিত পুরুষকে প্রকাশ করতে অর্থপূর্ণ কেনো শব্দের হদিসও অভিধানে পাওয়া যায়নি, আমি অন্তত পাইনি। তারমানে পাঠক, গৃহস্থালীর কাজকে নারীর একক কাজ বলে বিবেচিত করা হয় বলেই গৃহিণীপনার মতো শব্দগুলো অভিধানে থেকে যায়। যা প্রশ্নাতীত করে এই পুরুষতান্ত্রিক-বাস্তব যে, গৃহস্থালী কাজের দায়িত্ব একান্তই নারীর। পুরুষের না। আর এমনি করে নারীকে গৃহ-বন্দী রাখবার বাস্তবতা প্রবহমান থাকে, যদিও মেয়েরা এখন বাইরে যায়, কাজ করে, তবুও গৃহস্থালীর একক দায়িত্ব থেকে তার মুক্তি ঘটবার নজির আমাদের চেখের সামনে আসে না বললেই চলে। মানেটা দাঁড়ালো কি? আমরা যতোগুলো শব্দের মানে দেখেছি এবং বিশ্লেষণ করেছি তা থেকে এটা পরিষ্কার যে, ভাষার গড়নটা পুরুষতান্ত্রিক, পুঁজি-প্রেষিত পুরুষতান্ত্রিক জ্ঞান-ক্ষমতা-সম্পর্কের কারণে। প্রাক-পুঁজিবাদী দাস নারীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে। পুঁজিবাদ সস্তা শ্রমের লোভে অন্দরের নারীকে বের করে বানিয়েছে গার্মেন্টস এর শ্রমিক। শুধু রাজার অন্দরের নর্তকীকেই নয়, আরও আরও অনেক মেয়েকে পরিণত করেছে পুরুষতান্ত্রিক-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার রক্ষিতায়।


শেষের কথা
যে পুরুষতান্ত্রিক ভাষিক আধিপত্য ছিনালপনা আর সতীত্বের মাঝে অলঙ্ঘনীয় দেয়াল তুলে দিয়ে সম্ভ্রমের ফ্রেমে নারীকে বন্দী রাখে, তাকে ভোগ্য বানায়, তাকে পুঁজিবাদী পুরুষ আর পণ্যের মডেল বানায় (এইযুগ নারীকে শুধূ পণ্যের নয়, খোদ পুরুষতন্ত্রেরই মডেল বানিয়ে ছাড়ে। নেশা নয়, শুধুমাত্র ছেলেরা খায় বলে সিগারেট খাওয়াটা জরুরি হয়ে ওঠে মেয়েদের জন্য, যখন স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা সৌন্দর্য্য নয়, শুধুমাত্র ছেলেদের পোশাক বলে জিন্স আর ফতুয়া মেয়েদের পোশাক হয়ে যায়,তখন নারী খোদ পুরুষতন্ত্রেরই মডেল হয়ে যায়) একই সেই পুঁজিবাদী পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যই তার সম্ভ্রমহানী ঘটায়। তার ওড়না টেনে নেয়, তাকে ধর্ষণ করে, তার মুখে এসিড ছুঁড়ে দেয়। সঙ্গমের নামে তাকে পীড়ন করতে থাকে। তারমানে পাঠক, নারীর উপর বল প্রয়োগের শর্তগুলো সেই ভাষার মাধ্যমেই জারি রাখা আছে যে ভাষা তাকে সতীত্ব আর সম্ভ্রমের ফ্রেমে বেধে রেখেছে। সম্ভ্রম আছে বলেই শ্লীলতাহানী আছে, ধর্ষণ আছে বলেই আছে ধর্ষণযোগ্য। সতীত্ব আছে বলেই আছে বেশ্যার একমুখী অর্থের অস্তিত্ব। পুরুষতন্ত্র নারীকে তাঁর যৌনতার স্বাধীনতা, তাঁর মত প্রকাশের স্বাধীনতা, তাঁর অর্থনৈতিক স্বীকৃতি, তাঁর রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য, কবিতা লেখা কিংবা অন্য যেকোনো সাংস্কৃতিক তৎপরতার স্বাধীনতা থেকে দূরে রেখে তার উপর যে কর্তৃত্ব কায়েম করেছে আমাদের ভাষা তারই বাহন। এই ভাষার মধ্যে জারি থাকা পুরুষতান্ত্রিক-সংস্কৃতির চিহ্নগুলো আস্তে আস্তে মুছে ফেলতে না পারলে আমাদের পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষ শুধুমাত্র লৈঙ্গিক-ভিন্নতার কারণে তার মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতেই থাকবে। ক্ষুণ্ন হবে তার শারীরিক-মানসিক প্রতিটি চাহিদা, প্রতিটি মানবিক প্রাপ্তির অধিকার।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment