সহযোদ্ধার ভাবনাবিশ্ব 

বাচ্চাদের পণ্ডিত বানানোর দরকার নেই, মানুষ বানান

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 3 মিনিট

আমার ছোট ছেলে খুব চিন্তিত। সদ্য এসএসসি পেরুলো সে। ওর অনেক বন্ধুরা অনলাইনে প্রাইভেট পড়া শুরু করেছে। একটি কোচিং সেন্টারের নাম জানিয়ে বললো, সেখানে ওর অনেক বন্ধুরাই ভর্তি হয়ে গেছে। কোচিং ফি ১৪ হাজার টাকা।

আচ্ছা আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন কেউ, এই অনলাইন ক্লাশ, কোচিংয়ের ফায়দাটা কী? আপনারা ক্রম-বিস্মৃত হয়েছেন, বাংলাদেশের ৮০ ভাগের উপর বাচ্চারা গ্রামের। তারা গ্রামের স্কুলে পড়ে। তাদের কাছে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম রীতিমত ফ্যান্টাসি। যারা নাকি সুরে বলেন, ‘না না আমাদের অনেক উন্নতি হয়েছে এখন সবার হাতে হাতে স্মার্ট ফোন। আমরা সবাই মধ্যম টাইপ বড়লোক।’ এনাদের জন্য করুণা হয়। আজও গ্রামের ছেলেরা ছেড়া প্যান্ট গলিয়ে খালি গায়ে গাঁয়ের প্রাইমারি স্কুলে পড়তে আসে। সেকেন্ডারিতে যায় কুচকানো জামাটা হাতে সোজা করে শরীরে চাপিয়ে। তাদের কারো হাতে স্মার্টতো দূরের কথা বাটন টেপা ফোনও নেই। গ্রামের কলেজগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। তবে কলেজে কারো কারো হাতে ফোন দেখা যায়। কিছু স্মার্ট ফোনও রয়েছে। যেগুলো দোকান থেকে ডাউনলোড করা গান আর ছবি দেখতেই বেশি ব্যবহার হয়। মাঝেমধ্যে ফেসবুকিং। ইন্টারনেটের ব্যবহারও তাতেই সীমাবদ্ধ। এর বাইরে আর কোনো বাড়তি চিত্র নেই। এর বাইরে যা রয়েছে তা হলো ম্যাজিক রিয়েলিটি, জাদু বাস্তবতা।

বামপন্থীরা যাদের পেটি বুর্জোয়া বলেন, আমাদের নাকি সুরের সেই শহুরে মধ্যবিত্তরাই করোনাকালের অনলাইন ক্লাশ নামের ফ্যান্টাসি’র অগ্রদূত। যেনো দু’মাস না পড়লে বিদ্যা দিগগজ হওয়া থেকে পিছিয়ে পড়বে তাদের সন্তানেরা। বলিহারি এনাদের চিন্তার। এ চিন্তা মূলত সমাজ বিভাজনের। এ চিন্তা শ্রেণি বৈরীতার। আপনি মধ্যম আয়ের মধ্যবিত্ত। দুর্নীতির উদ্বৃত্ততে আপনার পকেটে খানিকটা খড়কুটো জমেছে, তাতেই আপনি ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন। একবার ভাবছেন না, আপনার ছেলে না হয় অনলাইনে ক্লাশ করতে পারছে, কিন্তু গ্রামের দরিদ্র কৃষকের, মজুরের ছেলেটি পারছে কি? পারছে না। আপনার এই চিন্তা নিশ্চিত শ্রেণি বিভাজনের সৃষ্টি করছে। শিক্ষা মৌলিক অধিকারের অন্যতম। এ অধিকারের বিভাজন অন্যায়, অসঙ্গত।

কথায় কথায় যারা উন্নতির কথা বলেন, যারা অনলাইন পড়াশোনা বলতে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন, তাদের প্রশ্ন করি, আচ্ছা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির র‌্যাংকিং এর এত করুণ অবস্থা কেনো? বিশ্ব শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের অবস্থানটা কোথায়? মাথা নিচু করা ছাড়া আর কোনো জবাব আছে কি আপনাদের কাছে? নেই তো, তাহলে এত উদগ্রতার প্রকাশ কেনো। আমাদের শিক্ষামন্ত্রীর একটা কথা শুনলাম কার কাছে যেনো। তিনি না কী বলেছেন, ‘এক বছর না পড়লে তেমন ক্ষতি হবে না, জীবন হারালে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে’, এমন কথা। শুনে খুব ভালো লাগলে। ভালো কথার আকালের দিনে এমন কথা সত্যিই আশা জোগায়। আমাদের শিক্ষামন্ত্রীর সেই সব শিক্ষকদের জিজ্ঞাসা করা উচিত, তাদের অনলাইন পড়াশোনার পেছনের উদ্দেশ্য কী শিক্ষা না বাড়তি কামাই। কারো কারো ক্ষেত্রে মুফতে প্রচার। যাতে করোনাকাল কেটে গেলে টিউশনিটা চুটিয়ে করতে পারেন।

দেশে করোনা সংক্রমন ক্রমেই সর্বোচ্চ চুড়ার দিকে যাচ্ছে। মন্ত্রীর স্ত্রী থেকে প্রতিরক্ষা সচিব, চিকিৎসক থেকে শিক্ষক, সাংবাদিক যোগ দিচ্ছেন মৃত্যুর মিছিলে। চারিদিকে আহাজারির শব্দ, কান্নার ফোঁপানো আওয়াজ। এরমধ্যে যারা অনলাইন পড়াশোনা নিয়ে রীতিমত আগ্রাসী হয়ে উঠেছেন, তাদের মানসিক সুস্থতা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করতে হয় এবং তা বাধ্য হয়েই। এখন যদি জার্মানির সাথে নিজেদের তুলনা করতে গিয়ে বলি, ওরা তো অনলাইন স্কুল চালাচ্ছে। বলি ভাই, জার্মানির শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা থাকলে একথা বলা সম্ভব নয়। আর সামাজিক ব্যবস্থায় তাদের প্রতিটি বাচ্চার কাছে ল্যাপটপ রয়েছে, ট্যাব রয়েছে। ওদের সবার ঘরে রয়েছে হাইস্পিড ইন্টারনেট কানেশকশন। ওদের পড়ার দায়িত্ব নিয়েছে রাষ্ট্র। আপনাদের?

যাক গে, তার থেকে তুলনা বাদ দিন, নিজের বাস্তবতার দিকে তাকান। নিজেরা তো বিভাজিত হয়েছেনই সন্তানদের আর বিভাজনের রাস্তায় ঠেলে দেবেন না। এমনিতেই কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার নামে দেশে এক অদ্ভুত শিক্ষা পদ্ধতি গড়ে উঠেছে। আধা বাংলা আর অর্থ ইংরেজি’র মিশেলে গড়ে উঠেছে এক কিম্ভুত প্রজন্ম! যারা বাংলাটাও ভালো বলতে পারে না, ইংরেজি তো ‘ব্রো আর সিস’ এর ‘মলোটভ ককটেইল’। বলতে পারেন, ‘আই অ্যাম জিপিএ ফাইভ’ প্রজন্ম। তাই বলি, এবার ক্ষান্ত দিন। বাচ্চাদের ‘বাংলিশ’ পন্ডিত বানানোর দরকার নেই, মানুষ বানান।

পুনশ্চ: ভুল বোঝার কোনো কারণ নেই। আমি অনলাইন শিক্ষার বিপক্ষে নই। কিন্তু সব কিছুর জন্য প্রস্তুতির দরকার রয়েছে। আপনি একশ জনের মধ্যে বিশ জনকে সুযোগ দিবেন, আশি জন থাকবে বঞ্চিত, এটা নেহাতই কূপমন্ডুকতা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment