Uncategorized 

ফাগুন বাবা, বন্ধুরা ঈদে ফিরছে তুই বাড়ি ফিরবি না?

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 2 মিনিট

ফাগুন, তোর সব বন্ধুরা ঈদে বাড়ি ফিরছে, তুই ফিরবি না বাবা? জানি, তুই ফিরবি না। তবু ইচ্ছেতো জাগেরে বাবা। তুইও তোর বন্ধুদের সাথে ফিরে আয়। সব ইচ্ছে পূরণ হয় না তাও জানি; সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট নিয়মেই চলে সবকিছু। তুই ফিরলে সেই নিয়মতো উল্টে যাবে বাবা, ঈশ্বর যাবেন ভয়ানক ঝামেলায় ফেঁসে। 

জানি, তুই ফিরলে ফিরতি ঈদের দু’দিন আগে। মানুষ আতংকে রয়েছে ডেঙ্গু নিয়ে। প্রতিদিন আসছে করুণতম সব মৃত্যুর খবর। দুই চলে আসতে পারতি, আমরাও চাইতাম তুই তাড়াতাড়ি চলে আয়। কিন্তু খবর ফেলে, দায়িত্ব ফেলে শুধু নিজের কথা চিন্তা করে চলে আসতি না তুই। তুই তো পালাতে শিখিসনি। 
নিজে রিপোর্ট করতে মাঠে থাকতি। ডেঙ্গুর কারণ, এডিস মশার বিস্তার, চিকিৎসার অসঙ্গতি, দায়িত্বশীলদের উল্টোপাল্টা বক্তব্য, সব নিয়েই লিখতি তুই। আর তোর লেখা সম্পর্কে তো সবাই জানে। ফাগুনের ভেতর কতটা আগুন আছে তা অজানা নেই অনেকেরই। 
ডেঙ্গু নিয়ে তোকে জানাই, গণমাধ্যমে দেখলাম এক দায়িত্বশীল বলেছেন, “দেশ উন্নত হচ্ছে বলেই দেশে ডেঙ্গু এসেছে। ডেঙ্গু মশা হচ্ছে ‘এলিট’ মশা।” ‘এলিট’র বাংলা হচ্ছে তো অভিজাত, তাই না-রে বাবা। তুইতো ইংরেজিতে সাবলীল। ইংরেজি পত্রিকার ভুল নিয়েও কথা বলেছিস তুই। চাইতি একটা শুদ্ধ ইংরেজি গণমাধ্যম, স্বপ্ন দেখতি শুদ্ধতার। 
‘এলিট’ হলো অভিজাত। আর অভিজাত হচ্ছে বিশেষণ পদ। যা বলতে বুঝায় উচ্চ বংশীয়, কুলীন, জ্ঞানী, ভদ্রোচিত, যোগ্য ইত্যাদি। অতএব এডিস মশা হচ্ছে এতসব বিশেষণের অধিকারী, যেহেতু তারা ‘এলিট’! আহারে! কী বিশেষণে বিশেষিত মশা। মাঝেমধ্যে মনে হয়, কেন যে মশা হয়ে জন্মালাম না। 
তুই শুনলে কী করতি, প্রথমে রেগে যেতি, তারপর হেসে ফেলতি। তারপর হাসিমুখেই খবর লিখতে বসে যেতি। তাও বিশুদ্ধ ইংরেজিতে। কারণ তুই মশা বচনের ‘এলিট’ নয়, বিশুদ্ধ ‘এলিট’। কুলীন, জ্ঞানী, ভদ্রোচিত এবং যোগ্য, সেই সাথে বিনয়ীও। যার ফলে সবার পছন্দের ছিলি তুই। 
দেশ উন্নত হয়েছে আর সে কারণেই ‘এলিট’ এডিস মশা এসেছে- কী বলি এমন কথার বিপরীতে, বলতো। এডিস যদি ‘এলিট’ হয় তাহলেতো শব্দটির অর্থই বদলে যায়। এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গুর ভাইরাস ছড়ায়। যে ভাইরাসে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। ঢাকার হাসপাতালগুলোর খবরাখবরেই বোঝা যায় কতটা ডেডলি এই ‘এলিট’ এডিস। এমন ‘এলিট’ হচ্ছে কষ্ট আর মৃত্যুর প্রতিক। তাহলে কি সো-কল্ড ‘এলিট’রাও তাই? তবে কি আমাদের দেশের কিছু লোক তেমনি ‘এলিট’? প্রজাতি ও শব্দগত সাযুজ্যের কারণেই কী এডিস মশা নির্মূল সম্ভব হচ্ছে না? কী জানিরে বাবা, এমন সংজ্ঞা এবং ব্যাখ্যায় মাথা নষ্ট হবার জোগাড়।
যাক গে, তুই ঈদে তো বাড়ি ফিরবি না। তুই এখন না ফেরার দেশে। বলতো, আমাদের ঈদ হয় কিভাবে! বড় ঈদ, কোরবানির ঈদ। তোকে ছাড়া কি কখনো গরু কিনতে হাটে গেছি? যাইনি তো। এবার তবে তোকে ছাড়া যাই কী করে! তোর মনে আছে, প্রতি ঈদের আগের সন্ধ্যায় গরু নিয়ে বাড়ি ফিরতাম আমরা। গতবারের আগের বার, বৃষ্টির মধ্যে তুই আমি আর ছোটে সন্ধ্যার পর গরু কিনে বাড়ি ফিরলাম। গরুটা তোর খুব পছন্দ হয়েছিল। ছোটে’রও। আমরা তিন জনই হাসিমুখে ফিরেছিলাম। 
ঈদের দিন সকালে তোকে ঘুম থেকে উঠাবার কী কসরত তোর মা আর ছোটে’র। তিনজন নামাজ শেষে ফিরে কোরবানি। এই তো সেদিনের কথা। তোর তো ভুলে যাবার কথা নয়। আমি, তোর মা, ছোটে আমরাও কেউ ভুলিনিরে। এসব দিন ভুলে থাকা কি যায়? নাকি তোকে ভুলে থাকা যায়? যায় না-রে বাবা। তুই তো চলে গেলি আনন্দ নগরে। জানি, তুই ভালো আছিস। তোর খারাপ থাকার কথা নয়। কাচের মতন ঝকঝকে স্বচ্ছ মনের মানুষেরা খারাপ থাকে কী করে! মহান সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই অতটা নিঠুর নন।
তুই এপারেও ভালো ছিলি, সবাইকে ভালো রাখার চেষ্টা করেছিলি। তোর সেই চেষ্টা বৃথা যাবে না, তোকে সৃষ্টিকর্তা ওপারেও ভালো রাখবেন নিশ্চিত। তোর প্রতিটি দিনকেই তিনি ঈদ করে দেবেন, আনন্দে ভরে দেবেন। তুই অনেক অনেক ভালো থাকবি-রে বাবা, ওপারে আনন্দনগরে।  
-তোর আব্বুজি, কাকন রেজা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment