দিনলিপি 

ফাগুন এবং একজন পিতার অপেক্ষা

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 3 মিনিট

আজ আমার ফাগুন চলে যাবার পনেরো মাস হয়ে গেলো। পনেরো মাস অনেকটা সময়। অনেক শোকই কেটে যায় এরমধ্যে। অনেকে বলেন শোকের আয়ু নাকি মাস ছয়েক। তারা যে কতটা ভুল বলেন, তা শুধু জানেন সন্তানহারা বাবা-মা। এই শোকের কোন আয়ু নেই, সীমা নেই।

আর আমার কথা, সে বর্ণনাতীত। একজন পিতা যখন এমন পুত্রকে হারান, যে তার আদলেই গড়া এবং তার চাওয়ার সবটাই যে পুত্র পূরণ করার যোগ্য হয়ে উঠছে, তখন সেই পিতা মূলত নিজেই মরে যান। তার পৃথিবী মরে যায়, তার অস্তিত্ব মরে যায়। আর তেমন পুত্র যদি খুন হন, তাহলে সেই পিতার পৃথিবীতে সব ছাপিয়ে শোক আর ক্ষোভটাই জেগে থাকে। তারোপর যদি সেই হত্যাকান্ডের বিচার না হয়, তখন সেই ক্ষোভ পরিণত হয় বিদ্রোহে। যেটা আমাকে দিয়ে আমি বুঝি।

আমি আমার সেই ছেলের কথা বলছি। তরুণ গণমাধ্যমকর্মী ইহসান ইবনে রেজা ফাগুনের কথা বলছি। যে শিকার হয়েছিলো গুপ্তহত্যার। ফাগুন, তরুণ বয়সেই যে লোভকে জয় করতে শিখে গিয়েছিলো। তরুণ একজন গণমাধ্যমকর্মীর নিজ ইচ্ছে এবং আকাঙ্ক্ষার কাছে হার মানা স্বাভাবিক। কিন্তু ফাগুন হার মানেনি। জীবনে কোনো প্রলোভনের সামনেই সে মাথা নোয়াননি। অকপটে সব চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করছে। তার ক্ষুদ্র জীবনে অনেক চ্যালেঞ্জকেই পাড়ি দিয়েছে সে হাসিমুখে। বাইশ বছরের একটি ছেলে যখন হাসিখেলায় মত্ত থাকে। তখন সে মত্ত ছিলো জ্ঞান চর্চায়। সময় নষ্ট না করে ঢুকে গিয়েছিলো কর্মজীবনে।

শুরুতেই সফল ছিলো সে। সাংবাদিকতায় অনেক বিজ্ঞজনেরই দৃষ্টি কেড়েছিলো জীবনের প্রথম প্রতিবেদনেই। তেমনি ফটোগ্রাফিতে ছিলো পারঙ্গম। তার তোলা ছবিও প্রশংসা কুড়িয়েছে প্রাজ্ঞ মানুষের। কী জানা ছিলো না ফাগুনের। বিজ্ঞান-সাহিত্য-কলা থেকে দর্শন-আইন এবং মনোবিজ্ঞান পর্যন্ত পড়া ও জানা ছিলো ওর। কী পরিমান পড়াশোনা ফাগুনের ছিলো যে তার সাথে কথা বলেছে সেই বুঝতে পেরেছে। অথচ এই জানা নিয়ে কোনো অহংকার ছিলো না তার। যখন বুঝেছে যার সাথে কথা বলছে, সে ততটা জানে না, তখনই আলাপ অন্য দিকে নিয়ে গেছে। কাউকে কখনো ছোট করেনি ফাগুন। এই যে ছোট না করা, এর বিপরীতে ক্রমেই বড় হয়ে উঠছিলো সে। বেঁচে থাকলে হয়তো মহীরুহ হয়ে উঠতো। হয়তো তার ছায়ায় অনেক মানুষ উপকৃত হতো।

বংশ পরম্পরার সাংবাদিকতা। দাদা-বাবা-নাতি। হ্যাঁ, ফাগুন ছিলো তৃতীয় পুরুষ। অন্য দিক দিয়ে ধরতে গেলে চতুর্থ পুরুষ। আমার নানাও সাংবাদিকতা করেছেন। সাংবাদিকতায় বাংলাদেশের ইতিহাস লিখতে গেলে যে পরিবারকে উল্লেখ করতে হবে, সে পরিবারেরই সে হয়ে উঠছিলো যোগ্য উত্তরপুরুষ। অনেকে বলতেনও এমন কথা। তাদেরও ধারণা ছিলো সাংবাদিকতায় দেশের অনেককেই ছাড়িয়ে যাবে ফাগুন। হয়তো তাদের সে ভাবনা মিথ্যা ছিলো না। সে ভাবেই গড়ে উঠছিলো ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন, ফাগুন রেজা। একটা খবরের জন্য কী কী উপাদান লাগে। একটা খবর কীভাবে তৈরি হয়। কীভাবে সংগ্রহ করতে হয় সব জানা ছিলো তার। সম্পাদনাটাও কীভাবে করতে হয় এই বয়সেই তা আত্মস্থ করে ফেলেছিলো সে। সহ-সম্পাদকের দায়িত্বেও সফল ছিলো ফাগুন। হ্যাঁ, ফাগুন কাজ করতো একটি গণমাধ্যমে সহ-সম্পাদক হিসাবে। তাও আবার ইংরেজি বিভাগে। তার সহকর্মীরা এখনো দ্বিধাহীন বলেন সে কথা।

ইংরেজিতে এতোটা ভালো ছিলো ফাগুন, ওর শিক্ষকরাও ওকে সমীহ করতেন। স্কুল জীবন থেকেই শুনে আসছিলাম ওর ইংরেজির প্রশংসা। নিজ মাতৃভাষার মতই ছিলো ইংরেজি ফাগুনের কাছে। লিখা এবং বলায় কোনো জড়তা ছিলো না, ভুল ছিলো না। ওর চলে যাবার পর তানজিল রিমন লিখেছিলেন ওর সম্পর্কে। লেখার শিরোনামই ছিলো, ‘একটি বিশুদ্ধ ইংরেজি গনমাধ্যম গড়তে চেয়েছিলো ফাগুন’ অনেকটা এ রকম।

এই ছেলে, এমন ছেলে যখন চয়ে যায়, সে পিতার তখন আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা কোনো কিছুই নয়। শুধু জেগে থাকে ক্ষোভ। বিচারের আকুতি। আজ পনেরো মাস সেই বিচার অধরা রয়ে গেছে। গেলো বছরের ২১ মে ফাগুন রেজা খুন হয়। তার লাশ ফেলে রেখে যাওয়া হয় জামালপুরের নান্দিনার কাছাকাছি জায়গায়। পুলিশ তদন্ত করতে গিয়ে খোঁজ পায় তার মুঠোফোনের। সেই সূত্র ধরে গ্রেপ্তার হয় একজন। জানা যায় হত্যাকারী দলের পান্ডার নাম। কিন্তু তারপরেই কেনো যেনো থেমে যায় সব। বদলি হয়ে যায় তদন্তকারী কর্মকর্তা। থেমে যায় তদন্ত ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম। কেনো যায় তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।

সাগর-রুনি থেকে ফাগুন রেজা, নিয়তি যেনো একই সূত্রে গাঁথা। সাগর-রুনি’র সন্তান মেঘ এখন বড় হয়ে উঠেছে। আর আমি হয়ে উঠছি বৃদ্ধ। আমার প্রতিটা দিন যায় এখন বিচারের রুদ্ধ অপেক্ষায়। সারাক্ষণ কানে বাজে ফাগুনের ফোনে ভেসে আসা শেষ কথা। নিখোঁজের মাত্র সতেরো মিনিট আগে আমার সাথে কথা বলেছিলো সে। আরেকটা গণমাধ্যমে কাজ করবে, সেখানে ইন্টারভিউ দিয়েছে, এমনটাই জানিয়েছিলো সেদিন। ঈদের পর যোগ দেবে কাজে এমন কথাও বলেছিলো। ঈদ এসেছে ঠিকই কিন্তু ফাগুন চলে গিয়েছে। সব ঈদের আনন্দ সাথে করে না ফেরার দেশে। পিতা হিসাবে আজ আমি বসে থাকি শোকগ্রস্ত এক তাপিত মানুষ। যার বুকের ভেতরে কেবলই ভাঙন। প্রতিদিন যে ভেঙে যায়, প্রতিদিন যে মরে যায়।  

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment