সহযোদ্ধার ভাবনাবিশ্ব 

প্রার্থিত অনিবার্যতা

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 3 মিনিট

গণমাধ্যমকর্মী বাধন অধিকারী দুটো বই পাঠিয়েছেন। একটা নিজের লেখা ‘প্রেম আর প্রতিরোধ’। অন্যটা সম্পাদনা, সমসাময়িক বিষয়ে, বর্তমান বাংলাদেশ আর দেশের পরিস্থিতি নিয়ে। সম্পাদনাকৃত বইটিতে বাধন অধিকারী’র নিজের লেখাও রয়েছে। অত্যন্ত সাহসী লিখা। ‘সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রে নাগরিকের জীবন’, তারই একটির শিরোনামের প্রথম অংশ এটি। এই লিখাটিতে বাধন প্রথমেই ‘নাশকতা শাসকতারই যমজ ভাই’, এমন একটি কথা উদ্ধৃত করেছেন তার এক শিক্ষক-বন্ধুর ফেসবুকের স্ট্যাটাস থেকে। আমিও এ কথাটুকুর উপরই জোর দিতে চাই। শুধু নাশকতা এবং আন্দোলন এক জিনিস নয়, এটা রাজনৈতিক দলগুলো বোঝে। আন্দোলনের কৌশলের মাঝে নাশকতা জুড়ে যেতে পারে। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে যা আমরা জেনেছি। আমাদের মুক্তির জনযুদ্ধেও কখনো-কখনো ব্রিজ কালভার্ট উড়িয়ে দিতে হয়েছে শত্রু সেনা ঠেকানোর জন্য। যুদ্ধ এবং আন্দোলনের কৌশল হতে পারে অনেক সময় এমন ব্যাপারগুলো। কিন্তু শুধু নাশকতা আন্দোলন নয়, শাসকতারই যমজ ভাই। কারণ এই নাশকতা, শাসকতাকেই দীর্ঘস্থায়ী করে। আর স্বৈরশাসকরাই নিজস্বার্থেই নাশকতাকে উৎসাহিত করে নানা উপায়ে। যেমন বৃটিশরা করতো হিন্দু-মুসলমানদের মাঝে অবিশ্বাস সৃষ্টি করে দাঙ্গা বাধানোর মাধ্যমে। এখনও ভারতে তাই হচ্ছে। শাসনকে পোক্ত করার জন্য বৃটিশ রাজনীতিরই প্রয়োগ করছে শাসকদল বিজেপি। উস্কে দিচ্ছে সাম্প্রদায়িকতাকে। ফলে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হচ্ছেন। যেমন, এদেশেও যখন কারো হিন্দুদের জায়গা-জমি দখল করার প্রয়োজন পড়ে, তখন উস্কে দেয় সাম্প্রদায়িকতা। কিংবা নানা কৌশলের প্রয়োগে ভয়ভীতি দেখিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে তাদের। ওই যে, নাশকতা শাসকতার যমজ ভাই।

বাধন অধিকারীর যখন জন্মেছেন তখন ১৯৮৪ সাল। ঠিক সে সময়টাতেই স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আমরা রাজপথে সোচ্চার। কেবল এসএসসি পাশ করে কলেজে ঢুকেছি। চোখে-মুখে সমাজ বদলের স্বপ্ন। প্রতিদিনই প্রায় মিছিল মিটিং। নানা পরিকল্পনা। কিভাবে মানুষকে আরো বেশি সম্পৃক্ত করা যায়। কিভাবে সভায় মিছিলে মানুষের ঢল নামানো যায় এই চিন্তাই মাথায় তখন। না, কোন নাশকতার চিন্তা ছিলো না। শুধু আন্দোলন আর বিজয়ের চিন্তা। আমরা ব্যর্থ হইনি। কারণ অমন স্বৈরতন্ত্রও মানুষের চাওয়ার কাছে মাথা নত করেছিল। টিকে থাকার প্রায় সকল প্রায়োগিক কৌশল অবলম্বন করেও যখন মানুষকে নোয়ানো যাচ্ছিল না, তখন পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিল সেই স্বৈরতন্ত্রের প্রতিভু। এখানে সত্যি স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। সেই সময়ে আন্দোলন দমনের প্রায়োগিক কৌশল অমানবিকতার চুড়ান্ত পর্যায়ে যায়নি। সে সময়, আন্দোলনের কালেই এইচএসসি দিয়েছি। কিন্তু ফলাফল সঙ্গতই খুব একটা ভালো হয়নি, অনেকের মতে চরম মেধাবী হওয়া সত্বেও। গায়ে মাখিনি, ওই ভালো না হওয়া ফলাফলকে উৎসর্গ করেছিলাম দেশের জন্য।

কিন্তু সেই দেশই আজ এতদিন পর প্রতিদানে দিলো আমার তীক্ষ্ণ মেধাবী তরুণ সন্তানের লাশ। বংশ পরম্পরার ধারাকে ধরে রেখে যে ছেলে আমার অজান্তেই ঢুকে গিয়েছিল গণমাধ্যমে, সাংবাদিকতার অভিযাত্রায়। হ্যাঁ, ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন অর্থাৎ ফাগুন রেজার কথা বলছি। মাত্র বিশ বছরে ঢুকে পড়েছিলো গণমাধ্যমের চাকুরিতে। বলেছিলাম কি প্রয়োজন। উত্তরে জানিয়েছিলো, ‘বিদেশে তো আঠারোর পরেই সন্তানেরা উপার্জন শুরু করে, আমিতো শুরু করছি বিশ থেকে।’ হাসতে হাসতে বলেছিলো, ‘আমিতো এদিক থেকে দু’বছর পিছিয়ে।’ ঝকঝকে তীক্ষ্ণ চোখের তরুণ, অন্তর্ভেদী মেধাবী দৃষ্টি। পরিষ্কার চিন্তা, লজিকের কোন ঘাটতি নেই। অন্যায়ের সাথে আপোষ নেই, চরিত্রে কোন অসততা নেই। কিন্তু এটাতো বাংলাদেশ, সমসাময়িক দেশটার সাথে তো এমন চরিত্রের যাওয়ার কথা না। এখানে প্রয়োজন আপোষকামিতা, সেলফ-সেন্সরশিপ, জ্বি হুজুর বলা ত্রিমাত্রিক ভাঁড়। ফাগুনের তো এমন সময়ে বেড়ে উঠা অসম্ভব। তাই তাকে বেড়ে উঠতে দেয়া হয়নি। হত্যা করা হয়েছে।

পেশাজীবী হিসাবে ফাগুনকে নিয়ে গর্ব করি আমি। না, আমার বাচ্চা ছেলেটি মাথা নোয়ায়নি, আপোষ করেনি। কিন্তু ভেঙে পড়ি পিতা হিসাবে। একেবারে ভেঙেচুড়ে যাওয়া একজন পিতা। তবে সাংবাদিক হিসাবে, গণমাধ্যমজন হিসাবে ফাগুন রেজা যেভাবে আপোষ করেনি, তারই পিতা হিসাবে আমৃত্যু আপোষ করবো না, এটা নিশ্চিত। লড়ে যাবো এই সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, স্খলিত রাষ্ট্রের সংস্কারে।

বাধন অধিকারীর লিখা পড়ছি, পড়বো। মাথায় রইলো। সব কথা বলার সময় আসেনি এখনো। এখনো প্রকৃতি তার খেলার শেষ চালটা চালেনি। এখনো অনেক দেখার বাকি। মুখোশ খুলে পড়ার বাকি অনেকটাই। পুরোপুরি যখন খুলে পড়বে, তখন দেখা যাবে ‍পুরো চেহারাটা। আলোচনার গন্তব্যটাও হবে পরিষ্কার। অনেকে বলবেন, লিখার প্রয়াস তো মুখোশ খোলারই প্রচেষ্টা। অবশ্যই, এতে কোন দ্বিধা নেই। কারণ লিখার উৎপত্তি চিন্তা থেকে, আর চিন্তা সৃষ্টি করে দ্বন্দ্বের এবং দ্বন্দ্ব থেকে বেড়িয়ে আসে সত্যটা। তবে উৎপীড়নের চাপে যখন দ্বন্দ্ব অপ্রকাশিত থাকে। সত্যের প্রকাশ নিয়ন্ত্রিত হয়। তখন প্রকৃতি তার নিজ তাগিদেই সত্যটাকে সামনে বের করে আনে। সত্যটা হলো প্রকৃতির সন্তানের মতন। সন্তান পরিপুষ্ট হলে প্রসব বেদনা উঠবেই। প্রকৃতি বাধ্য হয়েই প্রসব করবে সত্যকে। এর ব্যত্যয় সাধারণত হয় না। ইতিহাস তাই বলে।

বাধন অধিকারীদের মধ্যে আমি ফাগুনকে দেখি। কিংবা ফাগুনদের মধ্যে বাধন অধিকারীদের। দেখি আপোষহীনতাকে, মাথা উঁচু করে রাখার পৌরুষকে। তাদের বলি, হতাশ হবার কিছু নেই। আমি সন্তানহারা পিতা বলছি, ঈশ্বর যদি থাকেন, সর্বশক্তিমান বলে কেউ যদি থাকেন কিংবা প্রকৃতি, নিশ্চিত একদিন তার রোষে পড়তে হবে মানবতার বিরুদ্ধে যারা অমানবিকতার জয়োল্লাসে সামিল তাদের। ধ্বংস তাদের অনিবার্য। এই অনিবার্যতা মজলুম গণমানুষের প্রার্থিত।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment