সহযোদ্ধার ভাবনাবিশ্ব 

প্রত্যাশিত এক ব্রিফিং কাভারের অপেক্ষায়…

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 6 মিনিট

জানুয়ারির ১১ কিংবা ১২ তারিখের কথা। সকাল ১১টার দিকে আমার কর্মস্থল বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর সম্পাদক ইনাম আহমেদ আমাকে টেলিফোনে বলেন, চীনে একটা নতুন ভাইরাসের দেখা মিলেছে, অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে ওই ভাইরাস মোকাবিলার প্রস্তুতি কেমন, তা নিয়ে খোঁজখবর করতে বলেন তিনি।

বিষয়টা একেবারে নতুন আমার কাছে। ফোন রেখে বিবিসি ওয়ার্ল্ডে করোনা ভাইরাস নিয়ে একটি প্রতিবেদন পড়ি।  দুপুরে অফিসে গিয়ে ফোন করি আইইডিসিআর-এর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীরকে। তিনি বিষয়টি তার মত করে বুঝিয়ে বলেন আমাকে। জানান, চীনের একটি সামুদ্রিক খাদ্য-বাজার থেকে একটা ভাইরাস ছড়িয়েছে। তবে সে ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে কিনা তার প্রমাণ তখনও পাওয়া যায়নি। বিষয়টি সম্পর্কে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশকে জানিয়েছেও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে বাংলাদেশ কাজও শুরু করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা বিষয়টা নিয়ে কাজ করছে।

আইইডিসিআর-এর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীরের সঙ্গে কথা বলার পর রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সেই সময়ের পরিচালক অধ্যাপক সানিয়া তহমিনাকে ফোন করি। তিনি জানান, এয়ারপোর্টগুলোতে থার্মাল এক্সানারের মধ্য দিয়ে যাত্রীরা প্রবেশ করছে, সব এন্ট্রি পয়েন্টে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বিমানে যাত্রীদের বিশেষ ফরম পূরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেদিন থেকে করোনা মোকাবেলায় ‘প্রস্তুতি’র গল্প শোনা শুরু আমার।

কয়েকদিন পর আইইডিসিআর করোনাভাইরাস নিয়ে স্বাস্থ্য বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনা করে।  জানুয়ারির শেষের দিকে আইইডিসিআর করোনাভাইরাস নিয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন শুরু করে। চীনে কতজন নতুন শনাক্ত ও মারা গেছে সে তথ্যের পর ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়া আর কাশি শিষ্টাচার মানার পরামর্শ দিয়ে ব্রিফিং শেষ হতো। সুন্দর বাচনভঙ্গিতে আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা প্রতিদিন দুপুর ১২ টায় দেশবাসীকে করোনাভাইরাস সম্পর্কে সচেতন করতেন। করোনা মোকাবেলায় বিভিন্ন ধরণের প্রস্তুতির তথ্য দিতে থাকেন তিনি। অধ্যাপক সেব্রিনা মানুষের মাঝে পরিচিতি পেতে থাকেন।

১ ফেব্রুয়ারি উহান ফেরত ৩১২ বাংলাদেশিকে কোয়ারেন্টিন করা হয় আশকোনা হজ্জ ক্যাম্পে। সেই প্রথম মুখে বলা প্রস্তুতির সাপেক্ষে বাস্তব কর্মকাণ্ড দেখতে পায় মানুষ। প্রথম দিন সংবাদমাধ্যম কর্মীদের কাছে উহান ফেরতরা হজ্জ ক্যাম্পের পরিবেশ নিয়ে অনেক অভিযোগ করে। শেষমেষ অবশ্য উহান ফেরতরা সবাই সুস্থভাবেই বাড়ি ফেরেন।

ফেব্রুয়ারির ব্রিফিংগুলোতে গণপরিবহন এড়িয়ে চলা, অত্যাবশ্যকীয় না হলে বিদেশ ভ্রমণ না করার পরামর্শ আসতে থাকে। এদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে যখন বিভিন্ন দেশে ফ্লাইট বন্ধ ও নিয়ন্ত্রণ আরোপের নিউজ আসছিলো একের পর এক; আমার কর্মস্থল থেকে আমাকে বারবার অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া  হয় আমাদের দেশে ফ্লাইট কেন বন্ধ হচ্ছে না তা নিয়ে নিউজ করার৷ আইইডিসিআর এর পরিচালক অধ্যাপক সেব্রিনাকে ফ্লাইট বন্ধের প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলেই তিনি বলতেন এটি দ্বিপাক্ষিক বিষয়৷

ফেব্রুয়ারিতেই বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রতিবেদন করি: একটি ল্যাবেই হবে করোনাভাইরাস পরীক্ষা। আইইডিসিআর পরিচালক সে সময় বলেন, করোনাভাইরাস পরীক্ষার নিয়ন্ত্রণ একটি কেন্দ্রে থাকাই ভালো। অনেক ল্যাবে টেস্ট হলে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংসহ অনেক কিছু মেইনটেইন করা সম্ভব হবে না। আমার পরে অন্য কয়েকটি পত্রিকাও এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বেশি বেশি টেস্টের গুরুত্ব নিয়ে প্রায় সব সংবাদমাধ্যমেই অনেক অনেক রিপোর্ট হওয়ায় এখন অবশ্য ৩৪টি ল্যাবে করোনা টেস্ট হচ্ছে, আরও ১৪টি ল্যাব প্রস্তুত করা হচ্ছে। 

ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে আমার অফিস আমাকে অ্যাসাইন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশ কী করবে,  এখানে আদৌ লকডাউন সম্ভব কিনা, নিম্ন শ্রেণীর মানুষেরা বেশি পরিমাণে আক্রান্ত হলে কী হবে; সেসব বিষয়কে ফোকাস করতে। তবে  আমি প্রেস কনফারেন্সে এসব প্রশ্ন করতাম না। আইইডিসিআর এর কর্মকর্তাদের  একা পেলে তখন এসব নিয়ে জিজ্ঞেস করতাম। আমার প্রশ্ন শুনে তারা হাসতেন,  হাসতেন সাংবাদিক সহকর্মীদের একাংশও। আমি কিছুটা বিব্রত হতাম,  তবুও উত্তর জানতে চাইতাম। কারণ আমার কর্মস্থল আমার কাছে এইসব প্রশ্নের উত্তর চায়৷ তখন বলা হচ্ছিলো, লকডাউন হলে বিভিন্ন কমিটি নাকি বিভিন্ন এলাকায় খাবার পৌঁছে দেবে৷ এখন সেরকম কমিটি করে কিছু করা হচ্ছে কিনা আমি ঠিক জানি না। তবে তখন আমার তাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মনে হচ্ছিলো, যেন বাংলাদেশে লকডাউনের মত পরিস্থিতি কখনও হবে না।

ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে হোম কোয়ারেন্টিন, প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন শব্দগুলোর সাথে পরিচিত হতে থাকে মানুষ। আইইডিসিআর এর ব্রিফিংয়ে বিদেশ ফেরতদের ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে যে প্রবাসীরা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে না পেরে থার্মাল স্ক্যানার ভেঙ্গে বেড়িয়ে যায় তারা হোম কোয়ারেন্টিনে থাকবে কিনা; সেই সংশয় এড়াতে পারি না। আইইডিসিআর এর এক কর্মকর্তাকে বলেছিলাম সে কথা। উনি বলেছিলেন, ৫ লাখ বিদেশ ফেরতকে রাখার জায়গা কই বাংলাদেশের? আমিও ভেবেছিলাম তাইতো! কিন্তু আজকে এসে নিজেকে বোকা মনে হচ্ছে।  এখন তো কর্তৃপক্ষীয় দাবি অনুযায়ী বাংলাদেশ কয়েক লাখ রোগীকে কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা করছে। এর চেয়ে তখন বিদেশফেরত মানুষকে ১৪ দিন করে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন করা কি সহজ ছিল না?

৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। প্রথম মৃত্যু ১৮ মার্চ। এরপর থেকে আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংখ্যার বাইরে এসে অন্যদিকে নজর ফেরাই আমি৷ কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের চিকিৎসকেরা হাসপাতালে কাজ শেষ হলে তখন বাড়ি চলে যেতেন। এটি তাদের পরিবারের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বাইরের দেশগুলোর একাংশ কিন্তু চিকিৎসক নার্সদের হোটেলে রেখে  কোয়ারেন্টিন শেষে বাড়ি পাঠায়। আমি তাই স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকির দিকটি বিবেচনায় রেখে ভাসা ভাসা ধারণা নিয়ে কুয়েত-মৈত্রীর ডাক্তার ও বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে নিউজ করি।

মার্চেরই কোন একটা দিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দেখতে পাই করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের জন্য ২৯ টি আইসিইউ বেড প্রস্তুত করা হয়েছে। তখন বিশেষজ্ঞ মন্তব্য নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন করি। প্রথম পাতায় সিঙ্গেল কলাম ট্রিটমেন্ট পাওয়া নিউজটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভালোই ছড়িয়ে পড়ে। করার সময় আমি নিজেও নিউজটার গুরুত্ব বুঝতে পারিনি সেভাবে। তিন চারদিন পর দেখতে পাই আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে আমার করা সেই প্রতিবেদনের রেফারেন্স দেওয়া হয়েছে।

ডাক্তারদের আক্রান্ত ও কোয়ারেন্টিনে যাওয়ার হার বৃদ্ধির ঘটনা ধরে মার্চে প্রতিবেদন করেছিলাম। সেই প্রতিবেদন রচনা করতে গিয়ে অবাকই হয়েছিলাম। ফেব্রুয়ারিতে যখন আমার সম্পাদক আমাকে টেস্টিং কিট আর পিপিই-সংক্রান্ত প্রস্তুতির বিষয় খতিয়ে দেখতে বলতেন; আমি তখন অধ্যাপক সেব্রিনা ফ্লোরার ভাষ্যই অফিসকে মুখস্থ উগড়ে দিতাম। বলতাম, পর্যাপ্ত মজুদ আছে। তবে মার্চের শেষের দিকে এসে শুভঙ্করের ফাঁকিগুলো চোখে পড়তে থাকে৷ আর অবাক হতে থাকি।

তিন মাস আগে প্রস্তুতির কথা জানাতে গিয়ে দেড়শো আইসিইউ বেডের কথা বলা হয়েছিলো। এপ্রিলের শুরুর দিককার এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের জন্য ১২০টি আইসিইউ বেডের হিসেব দেন। মে মাসে এসে এখন অবশ্য কোভিড রোগীদের জন্য আইসিইউ বেড আছে সাড়ে তিনশ’র মত।

২৬ মার্চ দেশে সাধারণ ছুটি শুরু হয়, অফিস যাওয়া কমতে কমতে বন্ধ হয়ে যায়। শুরুর দিকে লকডাউনে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার দেখতে যেতাম, নিউজ করতাম। প্রাইভেট হাসপাতালগুলো যখন ব্যবসা নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত আমরা তখন রোগীর ভোগান্তি নিয়ে নিউজ করি। এর মাঝে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনলাইন ব্রিফিং শুরু হলে আমারও ঘরে বসে অফিস শুরু হয়। সাংবাদিকেরা ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করে, ন্যূনতম হলেও এক ধরনের জবাবদিহিতা শুরু হয়। বরাবরই প্রশ্ন করার বিষয়ে কিছুটা ইন্ট্রোভার্ট আমি। তাই প্রেস কনফারেন্সে কখনও প্রশ্ন করিনি। অন্যরা প্রশ্ন করলে আমি আমার উত্তর পেতাম, নিউজ করতাম। একমুখী তথ্যপ্রবাহের ধারার বাইরে এসে এই টু-ওয়ে কমিউনিকেশনের মধ্য দিয়ে যতটুকু জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলো, আমি সেটাকেই উপভোগ করতে শুরু করলাম।

হঠাৎই একদিন শুনলাম ব্রিফিং আর হবে না। প্রতিদিনের পরিস্থিতিকে বুলেটিন আকারে হাজির করবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেখানে কোনবো প্রশ্ন থাকবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানালেন সাংবাদিকদের সাথে আলোচনা করেই তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে আমিও এই বিটের একজন সাংবাদিক। আমার সঙ্গে তো তারা কোনও আলোচনা করেননি? কোন সাংবাদিকদের সঙ্গে তারা আলোচনা করেছেন? জানি না।

এরপর থেকেই শুরু হলো বুলেটিনের নামে রিডিং পড়ার কর্মসূচি। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ শত প্রচেষ্টাতেও আড়াল করা যায় না। করোনা-পরবর্তী পৃথিবীতে নিশ্চয় আমাদের এই সময়ের সবার কাজের পোস্টমর্টেম হবে। আমার বিশ্বাস, সেই সময় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ব্রিফিং বন্ধের বিষয়টিও আলোচনায় আসবে। এ দেশের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ক বিদ্যায়তনিক পরিসরে আজকের এই ব্রিফিং বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি হয়তো নিকৃষ্ট যোগাযোগ কিংবা সেন্সর-প্রক্রিয়ার উদাহরণ হিসেবে পাঠ্য হবে।

আস্তে আস্তে বুলেটিন নামক অনুষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ আইইডিসিআর এর হাত বদলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে যায়। এখন প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, বাড়ছে মৃত্যু৷ এর পেছনে আরও অনেক  গল্প তৈরি হচ্ছে। আমরা সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা এর সাক্ষী হচ্ছি। মানুষ টেস্ট করতে কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছে না। নন-কোভিড রোগী বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে।  কোভিড রোগী অফিসের নাম্বারে ফোন করে আমাকে খুঁজছে; আমার কাছে জানতে চাইছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ফোন ধরছে না কী করবে তারা। নার্সরা ভালো নেই, ডাক্তাররা ভালো নেই- আসলে কোনও মানুষই ভালো নেই। সেই খারাপ থাকার গল্পগুলো শুনছি রোজ। আমরা সংবাদ প্রতিবেদন করছি, মানুষের কথা বলার চেষ্টা করছি, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা মানুষকে জানাচ্ছি।

সংবাদ খুঁজতে গিয়েই জানলাম, দেশে ১১ বছর ধরে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেয়া হয়নি। আইসিইউ চালানোর দক্ষ লোক নেই। এতসব নেই আর নেই-এর মধ্যেই চলছে সবকিছু। স্বাস্থ্য বিটে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে শিখেছি, মহামারি মোকাবেলার জন্য কোনও দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই আসলে আগাম প্রস্তুত থাকে না। তবে দ্রুততর সময়ের মধ্যে প্রস্তুত হতে হয়। সেই প্রস্তুতির প্রশ্ন উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র-ইতালি-স্পেন-যুক্তরাজ্যের মতো অনেক উন্নত দেশও কোভিড-১৯ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। আবার বিপরীত বাস্তবতাও আছে। যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার মধ্য দিয়ে ভিয়েতনাম, নিউ জিল্যান্ডের মতো দেশগুলো কিংবা কেরালার মতো ভারতীয় রাজ্যে সংক্রমণকে মোকাবিলা করা গেছে চমৎকারভাবেই।

এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন-প্রাপ্ত (ইমার্জেন্সি ইউজ অথোরাইজেশন) একটি ভাইরাস-প্রতিরোধী ওষুধকে বাংলাদেশেও উৎপাদনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। দেশের আটটি ওষুধ কোম্পানি রেমডেসিভির নামের ব্যয়বহুল সেই ওষুধটির উৎপাদন প্রক্রিয়ায় রয়েছে। যে রোগীর ক্ষেত্রে সম্ভাব্য আর কোনও বিকল্প চিকিৎসার সুযোগ নেই, কেবল সেইসব গুরুতর অসুস্থদের ক্ষেত্রেই এই ওষুধ ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে আমাদের দেশীয় মিডিয়ার একাংশের সংবাদভাষ্য পড়ে মনে হচ্ছে, যেন এটাই করোনার মহৌষধি। বস্তুত ওষুধ উৎপাদক প্রতিষ্ঠান আর করপোরেট সংবাদ-মাধ্যমের সম্পর্কসূত্রই এই ওষুধকে ইতিবাচকভাবে বিজ্ঞাপিত করছে; যা নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার কোনও কারণ নাই। রেমডিসিভিরের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা কিন্তু সচেতন করেছেন।

আমি যতটুকু যা বুছি বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য শর্ত হলো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠ ও অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা। না হলে গুজব ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে। করোনা মহামারি এসেছে নয়া প্রযুক্তি-সমন্বিত তথ্যের মহামারির যুগে। এখন সঠিক তথ্য বেছে নেওয়ার কাজটাই কঠিন। তাই মূলধারার সংবাদমাধ্যমের জন্য অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে গুজবকে প্রতিহত করার চ্যালেঞ্জটা এখন অতীতের যে কোনও সময়ের চেয়ে বেশি।

ভয়ে ভয়ে থাকি, করোনা-পরবর্তী পৃথিবীতে আমি কিংবা আমার চেনা-জানা মানুষেরা, কিংবা আমার আপনজনেরা সবাই থাকবে কিনা। চার চারটি হাসপাতাল ঘোরার পর রিকশার পায়ের কাছে মৃত স্বামীকে বসিয়ে মাস্ক পরিহিত নারীর ভাবলেশহীন ছবি যখন সংবাদমাধ্যম কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখি, আমি তখন ভীষণ ভীত হয়ে পড়ি। নিজেকে সরাতে পারি না সমানুভূতির অনুভব থেকে। সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকি, এমন আরও কত কত ছবি আমাকে দেখবে হবে।

তবে ভীতি-ছড়ানোর মতো এইসব ছবি আমি দেখতে চাই না। যেমন করে নেতিবাচক সংবাদ লিখতে বাধ্য হচ্ছি, তেমন রিপোর্ট আর লিখতে চাই না। মন খারাপ করা নিউজ আর কত লিখব? আমি তাই আশা হাতড়ে ফিরি। মনে মনে কল্পনা করি, আমি আইইডিসিআর এর সম্মেলন কক্ষে মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার ব্রিফিং কাভার করছি… অধ্যাপক ফ্লোরা বলছেন-আপনারা জেনে খুশি হবেন বিগত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন কোনও রোগী শনাক্ত হয়নি… উনি বলবেন, আক্রান্তরা সবাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।

হুম পাঠক, এমনই একটা নিউজ লেখার অপেক্ষায় রয়েছি আমি। জানি না, এই অপেক্ষার পরিসর ঠিক কতখানি দীর্ঘ হবে। জানি না, তার আগে আরও কত মানুষকে হারাতে হবে। কত কিছু হারাতে হবে।

লেখক: স্টাফ করেসপনডেন্ট, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment