দিনলিপি যে ঘটনা খবর হয়নি 

পৃথিবীর আদিতম উপাসনালয়ে কয়েক প্রহর

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 3 মিনিট

তারিখ: ২৫ এপ্রিল, ২০১৯

বাস থেকে নামতেই কড়া রোদ এসে চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ল। পুরো তুরস্কে গরমকাল শুরু না হলেও এই শহরটিতে তুলনামূলকভাবে একটু বেশি গরম যেন। আমরা এসেছি তুরস্কের উরফা শহর থেকে ১৯ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত গোবেকলি তেপে’তে। এটি তুরস্কের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মাঝে একটি। আনুমানিক ৯,৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এটি নির্মিত হয়। যা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে পুরনো স্থাপনা।

বাস থেকে নেমে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। পাহাড়ের গা বেয়ে বিছানো কাঠের পাত দিয়ে হেঁটে হেঁটে মূল স্থাপনায় গিয়ে পৌঁছালাম। আমাদের সাথে আছে আরও ১৬ টি দেশের প্রায় ৫০ জনের মত। মূল স্থাপনাটি সাদা ছাউনি দিয়ে ঢাকা। পর্যটকদের দেখার সুবিধার্থে এটির চারপাশে কাঠের পাত বাসানো হয়েছে। আমরাও হেঁটে হেঁটে দেখা শুরু করলাম।

পাথরগুলি দেখতে ইংরেজির ‘T’ বর্ণের মত

‘গোবেকলি তেপে’ শব্দের অর্থ মোটা পেট বিশিষ্ট পাহাড়। এটির অবস্থান সমতল থেকে অনেক উঁচু একটি পাহাড়ে। এর নির্মাণ ১২ হাজার বছর আগে বলে ধারণা করা হয়। নির্মাণ কাজ শেষ হতে প্রায় দশ বছর সময় লেগেছিল। নির্মাণের পর পরই একে ঘিরে বসতি গড়ে উঠতে থাকে। যার স্থায়িত্বকাল ছিল আনুমানিক দুই হাজার বছর। আমরা এর চার পাশে ঘুরে দেখার সময় এর অনেক নিখুঁত ভাস্কর্য দেখতে পাই। কোনটি কুমিরের মত দেখতে, আবার কোনটি বানরের মত। তবে এই খোদাই কাজের নিপুণতা দেখে ওই সময়ের মানুষগুলোর শিল্পবোধের অসাধারণত্বের কথা মাথায় আসে।

গোবেকলি তেপে ঘুরে দেখার সময় একটি বিষয় চোখে পড়ল- এই ঘর গুলোর কোন প্রবেশদ্বার নেই। এ কারণেই হয়ত এটিকে একটি উপসানালয় হিসেবে ধারণা করা হয়। এর আরেকটি বিশেষ দিক হল, ঘরের ভিতরে অনেক বড় বড় পাথরের খণ্ড। এগুলোর ওজন২০ থেকে ৬০ টনের মত। পাথরগুলি দেখতে ইংরেজির ‘T’ বর্ণের মত খানিকটা। অখণ্ড পাথরগুলি দেখে এগুলোকে এখানে বয়ে আনার বিষয়টি নিয়ে না ভেবে কোনও উপায় থাকে না। কারণ এত ওজনের পাথরগুলো পাহাড়ের এই চুড়ায় ওঠানো অবশ্যই সহজ কোন কাজ ছিল না। মনুষ্যশ্রমই যে সভ্যতার আদি-অন্ত, সে কথা আবারও টের পেতে বাধ্য হোই।

এই ভাস্কর্যের নেপথ্যে যে কতো মানুষের দাসত্বের, কতো মানুষের বাধ্যতামূলক শ্রমের কান্নাগাঁথা চাপা পড়ে আছে, তার কোনও হদিস হয়তো কোনদিন মিলবে না।  

খনন কাজ

গোবেকলি তেপের কথা প্রথম উঠে আসে ১৯৬০ সালে। ইস্তানবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রত্নতত্বের শিক্ষার্থীর গবেষণাপত্রে এ নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত। কিন্তু এতে বিস্তারিত বর্ণনা না থাকায় খুব একটা প্রচার পায়নি। তবে ১৯৯৪ সালে গোবেকলি তেপের প্রতি নতুন করে আকৃষ্ট হন জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্লাউস শ্মিট। তিনি খনন কাজ শুরুর পরেই বুঝতে পারেন যে তার হাত দিয়েই হাজার বছর পুরনো ইতিহাসের পুনর্জন্ম হতে চলেছে। আর এরইসঙ্গে আস্তে আস্তে গোবেকলি তেপের কথা খুব দ্রুতই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তাই এর সংরক্ষণে ২০১০ সালে প্রথম এগিয়ে আসে ‘গ্লোবাল হেরিটেজ ফান্ড’। তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে ‘জার্মান আর্কিওলজিকাল ফাউন্ডেশন’, ‘জার্মান রিসার্চ ইনস্টিটিউট’, ‘উরফা মিউনিসিপাল গভার্নমেন্ট’, এবং ‘তুর্কিশ মিনিস্ট্রি অব ট্যুরিজম অ্যান্ড কালচার’।

আমরা মূল স্থাপনা ঘুরে দেখে এর পাশেই নবনির্মিত যাদুঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। সেখানে খনন কাজের সময় পাওয়া মূর্তির অনুকরণে সাজিয়ে রাখা কয়েকটি ডামি দেখতে পেলাম। এর পাশেই কয়েক ভাষায় দেয়া আছে এর বিস্তর বর্ণনা। পাশেই আবার চোখে পড়ল সে সময়ের ব্যবহৃত বল্লমের ফলাসহ আরও অনেক ব্যবহৃত আসবাবপত্র। এগুলোর সবগুলোই পাথর দিয়ে বানানো হয়েছে। এর পরেই 3D প্যানয়ারমাতে গিয়ে ঢুকলাম আমরা। সেখানে ভিউজুয়াল গ্রাফিক্সের মাধ্যমে মানুষের বিবর্তনের ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

এসকল কিছু ঘুরে দেখতে দেখতে হঠাৎ খেয়াল করলাম, ঢোকার সময় মুখে আলতো আঁচর দেয়া কড়া রোদের সূর্যটি আস্তে আস্তে পাহাড়ের পিছনে গা ঢাকা দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। আমরাও তাই সন্ধ্যা নামার আগেই আমাদেরকে বহন করা বাসে গিয়ে বসলাম।

লেখক: তুরস্কের সেলযুক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ও ফ্রিল্যান্স সংবাদকর্মী

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment