কথোপকথন দিনলিপি 

‘দুদকের চিঠি হুমকিমূলক ও অগ্রহণযোগ্য’

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 4 মিনিট

অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিকতার এক স্বনামধন্য সাংবাদিক দীপু সারোয়ার। জঙ্গিবাদ বিষয়ক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় বাংলাদেশের অন্যতম পথিকৃত তিনি। সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ও অধিকার প্রশ্নে বরাবরই সোচ্চার। দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব)সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। দীপুর বর্তমান কর্মস্থল দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউন। সেখানে তিনি বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত। ওই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তার এক এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনকে ঘিরে গত দুই/তিন দিন ধরে তোলপাড় চলছে সাংবাদিক কমিউনিটিতে।

বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত দীপু সারোয়ারের এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে উঠে আসে ডিআইজি মিজানুর রহমানের সঙ্গে দুদক কর্মকর্তাদের ঘুষ লেনদের প্রসঙ্গ। হাতে আসা অডিও রেকর্ডের ভিত্তিতে দীপু সারোয়ার তার প্রতিবেদনে জানান, ডিআইজি মিজানুর রহমান তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত থেকে নিষ্কৃতি পেতে সরাসরি ও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘুষ লেনদেন করেছেন।  অভিযোগটি তদন্ত করতে বাধ্য হচ্ছে দুদক। তদন্তের অংশ হিসেবে দীপুকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য চিঠি দিয়েছেন দুদক পরিচালক। চিঠিতে বলা হয়েছে, সাক্ষ্য না দিতে গেলে আইনানুগ কার্যধারা গৃহিত হবে’। এই চিঠিকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি সাংবাদিক কমিউনিটি। সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ হয়েছে। প্রতিবাদী কর্মসূচি পালিত হয়েছে দুদক কার্যালয়ের সামনেও।

চিঠিটির ব্যাপারে দিনলিপিকে একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন দীপু। তিনি দুদকের চিঠিকে হুমকিমূলক, ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, চিঠির ভাষা আপত্তিকর, তিনি বড়জোর সহযোগিতা করতে পারেন। সংবাদকর্মী হিসেবে দুদকে গিয়ে সাক্ষ্য দেওয়া তার দায়িত্ব নয়। দিনলিপির পক্ষে দীপু সারোয়ারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাধন অধিকারী। অডিও থেকে অনুলিখন করেছেন জাহিদুল ইসলাম জন। পাঠকের জন্য সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো।

দিনলিপি: কোনও প্রতিবেদক যখন অপরাধ/দুর্নীতি বিষয়ক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, তখন সেই ঘটনা তদন্তে প্রতিবেদকের সহায়তা নেওয়া নতুন কিছু নয়। তবে আপনাকে পাঠানো দুদকের চিঠির বিশেষত্ব হলো, আপনাকে আইনি এখতিয়ার খাটিয়ে সাক্ষ্য দিতে তলব করা হয়েছে এবং সাক্ষ্য না দিলে আইনানুগ কার্যধারা গ্রহণের হুমকি দেওয়া হয়েছে। চিঠিটির ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

দীপু সারোয়ার: চিঠির ভাষা নিয়েই মূল সমস্যা। কমিশন আইনের ১৯ ও ২০ ধারা ও কমিশন বিধিমালার ২০ বিধিসহ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬০ ধারা অনুযায়ী তারা মূলত আমার সাক্ষ্য নিতে চেয়েছে। তবে রিপোর্টারকে এভাবে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যায় না। বড়জোর তথ্যপ্রমাণ দিয়ে তার সহায়তা চাওয়া যেতে পারে। তবে আমার প্রশ্ন, এই সহযোগিতা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমি কেন আমি তাদের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করে সেখানে যাব? চিঠির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে: অভিযোগের বিষয়ে সাক্ষ্য শ্রবণ ও গ্রহণ প্রসঙ্গে। আবার চিঠির অন্য একটি জায়গায় লেখা হয়েছে, বক্তব্য প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হলো। মানে তারা আমাকে সাক্ষী বানাতে চায়। তো আমার সাক্ষী হওয়ার কোনও ইচ্ছে না। একজন রিপোর্টার হিসেবে এটা আমার দায়িত্ব নয়। চিঠির শেষ অংশে আমাকে বলা হয়েছে, হাজির হয়ে সাক্ষ্য না দিলে আইনানুগ কার্যধারা গৃহীত হবে। এটা সহযোগিতা চাওয়ার ভাষা নয়। এটা ভীতি প্রদর্শন। সহযোগিতা চাওয়ার ভাষা আর এই চিঠির ভাষাভাষা এক নয়। এই চিঠি হুমকিমূলক, ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অগ্রহণযোগ্য।

দিনলিপি: দুদক কার্যালয় থেকে যে চিঠি আপনাকে পাঠানো হয়েছে তা নিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদের পাশপাশি  দুদক কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ হয়েছে। সংবাদকর্মীকে পাঠানো একটি চিঠিকে কেন্দ্র সাংবাদিক কমিউনিটিতে যে তীব্র প্রতিবাদ আর প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তাকে অনন্যই বলতে হয়। বহুদিন ধরেই কোনও ইস্যুতে সাংবাদিকদের এমন তীব্র প্রতিবাদী হতে দেখা যায়নি। আপনাকে নিয়ে এটা হলো। আপনার প্রতি এই সংহতির নেপথ্যে বিশেষ কোনও কারণ আছে কী?

দীপু সরোয়ার: আজকে দুদক কার্যালয়ের সামনে যে কর্মসূচি পালিত হয়েছে তো আসলে কিন্তু কোনও সাংবাদিক সংগঠনের কর্মসূচি নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেরা আলোচনা করে বিভিন্ন সাংবাদিকেরা কিন্তু আজকের কর্মসূচি পালন করেছে। আমি নিজে একজন ক্রাইম রিপোর্টার, কিন্তু আজকের কর্মসূচিতে ল বিট, অর্থনীতি বিট, কূটনীতি বিটসহ ডেস্কে কাজ করাও সাংবাদিকেরাও অংশ নিয়েছেন। আমি যে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি তেমনটি না। তারা নিজেরাই দুদকের চিঠিকে নিজেদের জন্য হুমকি বলে মনে করেছে। কেন এমনটি হবে। সাংবাদিককে কেন সমন জারির মতো করে নোটিশ পাঠানো হবে। এই নিয়েই তাদের মূলত ক্ষোভ। আর সেকারণে নিজেদের দায়িত্ব বোধ থেকেই তারা আজকের কর্মসূচিটি পালন করেছে।

দিনলিপি:  কিন্তু আমরা জানতে চাইছি, অন্য অনেক ঘটনার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের এমন স্মতস্ফুর্ত প্রতিবাদ আমরা দেখি না সচারচর। সাংবাদিকের ওপর দমনপীড়ন তো হরহামেশাই হচ্ছে। তবে প্রতিবাদের এমন স্বতস্ফূর্ত নজির চোখে পড়ে না, যেটা আপনার ক্ষেত্রে হলো। নিশ্চয়ই আপনার কোনও ব্যক্তিগত ভূমিকা আছে এর নেপথ্যে। কী সেই কারণ?

দীপু সারোয়ার: অতীতে রিপোর্টিং-এর কারণে আমাকে নানা ধরণের হুমকি, নিপীড়ন ও প্রলোভন সামলাতে হয়েছে। পুলিশ আমাকে হাতকড়াও পড়িয়েছে। সেসব ঘটনা থেকে আমার পর্যবেক্ষণ: সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকাটা খুব জরুরি। সাংবাদিকদের কোনও সংগঠনের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপসহ নানাভাবে সাংবাদিক কমিউনিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা জরুরি। এই যেমন আমাদের অফিসের সহকর্মী আমানুর রহমান রনি, বাংলাভিশনের দীপন দেওয়ান, সময় টেলিভিশনের খান মোহাম্মদ রোমেল, সেলিয়া, একাত্তরের নাদিয়া শারমিন, চ্যানেল টুয়েন্টি ফোরের রাশেদ নিজাম সোশ্যাল-মিডিয়াভিত্তিক অ্যাক্টিভিজম করে। এদের যে গ্রুপগুলো আছে সেখানে, সেগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল মূলত রিক্রিয়েশনের জন্য। তবে আড্ডার পাশপাশি সাংবাদিক কমিউনিটি বিভিন্ন ইস্যুতে এই গ্রুপগুলোর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। অতীতে আমরা সাংবাদিক নিপীড়ন ও হুমকির ঘটনায় একসাথে কাওরান বাজারের সার্ক ফোয়ারা বা প্রেসক্লাবের সামনে, রিপোর্টর্স ইউনিটির সামনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছি। এসবের সঙ্গে আমার খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা ছিল। আমি মনে করি আমার জন্য তারা যেভাবে এগিয়ে এসেছেন সেটা মূলত তাদের নিজেদের জন্য এগিয়েই এসেছেন।

দিনলিপি: আপনার কথায় স্পষ্ট যে, কোনও ক্ষমতাশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অন্যায্য কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যদি সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা জারি থাকে তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর বিস্তৃত হবে। তাইতো?

দীপু সারোয়ার: এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু আর আমার বাঙালি জাতীয়তাবাদ তথা দেশ নিয়ে কথা বলতে আমি যেমন ভয় পাই না, তেমনি অন্যায়-দুর্নীতির বিরুদ্ধে  সৎভাবে তথ্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতা করতেও আমি ভয় পাই না। আমি আপনার আগের প্রশ্নে ফিরে যেতে চাই। আমি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করি, সেই প্রতিষ্ঠান আমার দুদক কর্মকর্তাদের ঘুষ লেনদেন বিষয়ক রিপোর্টিং-কে ঘিরে যেভাবে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে, তা অনণ্য। নেপথ্যে যেভাবে বিভিন্ন বিষয় আমার প্রতিষ্ঠানকে মোকাবিলা করেছে তা হয়তো কেউ কোনওদিন জানতে পারবে না। প্রতিষ্ঠানের এই ভূমিকাও আজকের স্মতস্ফূর্ত প্রতিবাদের নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছে।

দিনলিপি: দুদক যেভাবে স্বাক্ষ্যের জন্য আপনাকে তলব করেছে তাতে কী আপনি ভীত?

দীপু সারোয়ার: দুদক যে ভাষা ব্যবহার করে চিঠি পাঠিয়েছে তা নিয়ে ভয় পাওয়ার কিংবা তাতে সাড়া দেওয়ার কোনও কারণই নেই। দুদক যদি তাদের চিঠির ভাষা পরিবর্তন করে সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দেয় তাহলে সেটা আমার দিক থেকে বিবেচনা করার সুযোগ আছে। দুদককে সহযোগিতা করতে কোনও সাংবাদিকের আসলে অসুবিধা নেই। সব সাংবাদিকই তাদের সহযোগিতা করতে চায়। কিন্তু এভাবে ফোর্স করে, বাধ্য করার চেষ্টা করে, সমন জারির মতো করে চিঠি দেওয়ার বিষয়টি মেনে নেওয়ার মতো না। তাদের এই ডাকে সাড়া দেওয়ার সুযোগ নাই, এটি আসলে সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গেই সাংঘর্ষিক হয়।

আরেকটি বিষয় হলো দুদক তো আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের সাথে আমার কোনও ব্যক্তিগত রেষারেষি নেই, বিরোধ নাই। এই প্রতিষ্ঠানের যেটা মূল কাজ: দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ, সেটা অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে যাবে দেশের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক ও একজন সংবাদকর্মী হিসেবে সেটাই আমার আশাবাদ। দুদকে কর্মরত কেউ কেউ আমাকে যদি তাদের শত্রু মনে করে তাহলে সেটি তাদের ভুল । আমি দুদকের বিরুদ্ধে কোনও অবস্থান নিইনি। আমার রিপোর্টটি ছিল দুদক-সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার অসাধু তৎপরতাকে কেন্দ্র করে।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment