দিনলিপি 

ডেঙ্গু পরিস্থিতি: সাংবাদিকরা কি প্যানিক ছড়িয়েছে?

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 2 মিনিট

স্বাস্থ্য বিটের একজন সংবাদকর্মী হিসেবে ঢাকার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে আমাকে। নিঃসন্দেহে এটা ভয়াবহ পরিস্থিতি। চিকিৎসকরা বলছেন ডেঙ্গু পরিস্থিতি মহামারী পর্যায়ে গেছে। একই ধরনের মত জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন বা যাদেরকে আমরা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলে জানি তাদেরও। ঢাকার ভেতরে-বাইরে সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা দেখলে বোঝা যায় পরিস্থিতি কতোখানি ভয়াবহ। জুলাই মাসের শুরুর দিকে আমরা বলছিলাম,

ডেঙ্গু পরিস্থিতি মহামারীর দিকে যাচ্ছে। একটা সময় আমরা এসে দেখতে শুরু করলাম, কোনও হাসপাতালে সিট নাই।

প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, মালিবাগের সিরাজুল ইসলাম মেডিকেলে গিয়ে দায়িত্বরত একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা ডেঙ্গু রোগীকে কোথায় রাখছেন? আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, সবখানে ডেঙ্গু রোগী। প্রথমে কিছু কিছু হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগীর জন্য আলাদা ওয়ার্ড রেখেছিলো। পরে অধিকাংশ হাসপাতালে সব সিট ডেঙ্গু রোগীতে পূর্ণ হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলের শিশু ওয়ার্ডের একেকটা বেডে তিন/চারটা শিশুকে শোয়া দেখেছি। বারান্দায়, বাথরুম ও লিফটের সামনে স্রেফ একটা কাঁথা বা মাদুরের ওপরে শুয়ে রয়েছে ডেঙ্গু রোগী রয়েছে। ভাগ্যবানরাই সিট পেয়েছে। প্রত্যেকটা হাসপাতালে কিছু অতিরিক্ত বেড থাকে,
যাতে তারা দুর্যোগকালীন বা এমন পরিস্থিতিতে রোগীদের মেইনটেইন করতে পারেন। সিসিইউ বা আইসিইউতে এ রোগীদের রাখা হয়েছে।

নামি-দামি কর্পোরেট হাসপাতালেও প্রতিদিন ৫০/৬০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছেন, পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা বোঝানোর জন্য বলা। একটি বেসরকারি হাসপাতালের পরিস্থিতি এমন যে সেখানে আইসিইউ-তে থাকা  রোগীর আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেও বেড সংকটের কারণে তাকে সাধারণ বেডে নেওয়া যায়নি।

এমন অভিযোগও উঠেছে যে সংবাদমাধ্যমের কাভারেজের কারণে ডেঙ্গু নিয়ে ভীতি/প্যানিক সৃষ্টি হয়েছে। তবে সাংবাদিকরা কি এমনি এমনি প্যানিক কিংবা আতঙ্ক ছড়িয়েছে?

আমাদের জনপ্রতিনিধিরাও, বিশেষ করে মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, ডেঙ্গু হলে আতঙ্কিত হবেন না, এতে মৃত্যুর  ঝুঁকি কম।  হুম, এটা ঠিক যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সাপেক্ষে আনুপাতিকহারে মৃত্যুর সংখ্যা খুবই কম। তবে আমরা কি মৃত্যু হলেই কেবল আতঙ্কিত হব?
যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছে তার শারীরিক কষ্টটা আতঙ্কের বিষয় নয়? যে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে সেটা আতঙ্কের বিষয় নয়? আমার যে কর্মঘণ্টা লস হচ্ছে প্রতিদিন সেটা আতঙ্কের বিষয় নয়? অফিস থেকে ছুটি নিতে হচ্ছে, সঙ্গে চার/পাঁচটা অ্যাটেনডেন্ট থাকতে হচ্ছে, রোগীকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে নিতে হচ্ছে, আমি বেড পাচ্ছি না। এটা কি আতঙ্ক না?

তাহলে বলুনতো পাঠক, আসলে আমরা ভীতি ছড়িয়েছি নাকি সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করেছি? আসলে সংবাদমাধ্যমের সচেতন প্রয়াসের কারণেই অনেক অনেক মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হয়েছে। সংবাদমাধ্যম দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে বলে এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে আক্রান্ত কিংবা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকা নাগরিকদের মনে। সে কারণে তারা জ্বর বোধ করলেই ডাক্তারদের শরণাপন্ন হয়েছেন, পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে চেয়েছেন আসলেই তারা আক্রান্ত কিনা। সচেতনতার কারণেই যতটা না ডেঙ্গু আক্রান্ত তার থেকে অধিক মানুষেরা পরীক্ষা করিয়েছে। সবমিলে সংবাদকর্মীরা ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটা দায়িত্বশীল ভূমিকাই পালন করেছে। জনপ্রতিনিধিরা যে দায়িত্ব পালনে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে।

লেখক: বাংলা ট্রিবিউন-এর সিনিয়র রিপোর্টার

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment