কথোপকথন দিনলিপি 

‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অজানা ভীতি আমাদের মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে’

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 5 মিনিট

অভিনয় শিল্পীদের মধ্যে সামাজিক-রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে যাদেরকে আমরা সরব দেখি সচরাচর, তাদের মধ্যে বন্যা মির্জার অবস্থান নিঃসন্দেহেই সামনের কাতারে। টেলিভিশনের বাইরেও মঞ্চের একজন একনিষ্ঠ কর্মী তিনি। একইসঙ্গে অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের বিপণন বিভাগের প্রধান। ব্যক্তিগতভাবে পড়ুয়াদের জন্য বুক টক নামের একটা প্ল্যাটফর্ম চালান ফেসবুকে। সম্প্রতি ‘সংবাদকর্মীর দিনলিপি’র সঙ্গে পেশাগত দুই ক্ষেত্রের যোগসূত্র, সংবাদমাধ্যম, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সেন্সরশিপ এবং জেন্ডার সংবেদনশীলতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে একান্তে কথা বলেছেন তিনি।

বন্যা মির্জা বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের সেন্সরশিপ প্রশ্নে কথা বলতে গিয়ে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের প্রসঙ্গ টেনেছেন। তিনি বলেছেন, ওই আইনের কারণে একটা অজানা ভীতি আমাদের সবাইকে গ্রাস করতে শুরু করেছে, যা আমাদের সেল্ফ সেন্সরড হতে প্ররোচিত করেছে। দিনলিপির পক্ষে বাধন অধিকারীর নেওয়া সেই সাক্ষাৎকারের একটা সম্পাদিত ভাষ্য টেক্সট আকারে তুলে ধরা হলো।

পুরো সাক্ষাৎকারটি শুনতে ক্লিক করুন এই ভিডিও লিঙ্কে। 

দিনলিপি : মিডিয়ার দুই জগতে আপনার বিচরণ: একদিকে আপনি নাট্যকর্মী ও অভিনয়শিল্পী, অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমে কাজ করছেন। দুই কাজের ঐক্যসূত্রটা আসলে কী?

বন্যা মির্জা : আমি সংবাদমাধ্যমে কাজ করলেও সংবাদকর্মী তো নই। কাজ করি আলাদা একটা বিভাগে, বিপণন বিভাগ।  সেই সূত্রে কখনও কখনও যে ঐক্য তৈরি হয় না, তা তো নয়। তৈরি হয়। আমার সহকর্মীদের সাথেও বিভিন্ন সময় যখন কাজ করি তখন কিছু ঐক্য তৈরি হয়। একত্রে কাজ করার পরিবেশের কারণেই এটা হয়। আমি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করি, হয়তো সেই প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্যের কারণে এমনটা হয়। অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করলে এমনটা নাও হতে পারতো।

তবে বাইরের মানুষ আমাকে সংবাদকর্মী মনে করে; সাংবাদিকতা যে একটি দূরুহ কাজ, কঠিন কাজ, সেটি সবার বোঝাপড়ার মধ্যে থাকেও না। আসলে যে হুট করে অভিনেতা থেকে সংবাদকর্মী হওয়া যায় না, এব্যাপারে তাদের কোন পরিষ্কার ধারণা নেই। কখনও কখনও তো কেউ কেউ বলেই ফেলেন আমাকে যে, আপনিতো সাংবাদিক। তবে এমন দুটি সত্তা আমার মধ্যে নেই। আমি ছিলাম অভিনেতা, কিন্তু কাজ করি একটি সংবাদমাধ্যমের অন্য একটি বিভাগে। আমার কাজটা আলাদা।

দিনলিপি : বিপণনের সঙ্গে তো সংবাদমাধ্যমের কনটেন্টের সাথে একটা সম্পর্ক আছে।

বন্যা মির্জা : সেখানেই আসলে যোগসূত্র সৃষ্টি হয়, সেই কন্টেন্টের জায়গাতেই । অভিনেতা না হয়ে যদি আমি পরিচালক হতাম তাহলে হয়তো আরও বেশি কানেক্টেড পারতাম। এজেন্সির সাথে কাজ করলে আরও সুবিধা হতো কন্টেন্ট ডেভেলপমেন্টের কাজ করতে। আমি অভিনেতা ছাড়াও আমার দীর্ঘ একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে  থিয়েটারের। সেটাও আমার ভীষণভাবে কাজে লাগে। আমার পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে সংবাদমাধ্যমেও নান্দনিক ইভেন্ট তৈরি করতে হয়, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে বিদেশি অতিথি ম্যানেজ করতে হয়, উৎসব করতে হয়। ছোট থেকে বড় ইভেন্ট নিজেরা করি। কনটেন্টের জায়গায় সারাক্ষণ নতুন নতুন বিষয় তৈরি করতে হয়। টেলিভিশনের বাইরে অনলাইনেও ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে। তো যোগসূত্র তো নিশ্চয় একটা আছে।

দিনলিপি: বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম নিয়ে আপনার অবস্থান জানতে চাই। যদি বলি মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সেন্সরশিপের বিবেচনায় বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ঠিক কোন জায়গায় অবস্থান করছে, আপনি কী উত্তর দেবেন?

বন্যা মির্জা: আমি মনে করি সারা বিশ্বেই সংবাদমাধ্যমের পরিস্থিতি একই রকম। বাংলাদেশও সেটার বাইরে নয়। সংবাদমাধ্যম তো রাষ্ট্রের বাইরে আলাদা অবস্থান তৈরি করতে পারে না। রাষ্ট্র সামগ্রিকভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে, সংবাদমাধ্যমতো সেখানে আলাদা করে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না। আসলে পারে না বলা ঠিক হবে না, বলতে চাইছি পারা যায় না। আর আদৌ কখনও সেটা পারবে কিনা, তা নিয়ে আমার ধারণা নেই। ছোট করে যদি মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সেন্সরশিপের বিবেচনায় বলতে চাই: আামার মনে হয় খুব ইউনিক কোনও অবস্থানে আমরা নেই।

দিনলিপি: রাষ্ট্রের কথা যদি বাদ দিই, তো এর বাইরেও একটা নিয়ন্ত্রণ/সেন্সরশিপের পরিসর আছে। সেটা হলো কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ। যদি পাশ্চাত্যের বাস্তবতা চিন্তা করি, তো সেখানে ৫/৬টা বড় বড় কর্পোরেশন গোটা সংবাদ জগতের নিয়ন্ত্রক। তো, বাংলাদেশে কিন্তু এমন বৃহৎ কিছু কর্পোরেশনের মধ্যে সবগুলো সংবাদমাধ্যমের অবস্থান নয়। সেটা তো একটা ইতিবাচক দিক, নাকি? এই বাস্তবতার কোনও ইতিবাচক প্রভাব কি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে দৃশ্যমান?

বন্যা মির্জা: আমার মনে হয় না। বরং এখানে ভীতির ব্যাপারটা অনেক বেশি রয়ে গেছে, যেটা কিনা নিজেই উত্তোরণ করা যেত। তবে কোনও না কোনও একটা অজানা ভীতি আমাদের গ্রাস করে রেখেছে। যেখানে আমরা কিনা কথা বলতে গিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়, এই বলার ফলাফলটা ভবিষ্যতে কী হবে। এর নেপথ্যে তো একটি আইনের কথা আমরা বলতেই পারি। ডিটিজটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার বদলে যেটা প্রণীত হয়েছে। পাশ্চাত্যে এতোটা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আছে কি সংবাদমাধ্যমের ওপর? সম্ভবত না। তবে বাংলাদেশে এই আইনের ভীতিতে সেল্প সেন্সরশিপটা অনেক বেশি। রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেয়া ভীতির বাইরে যেতে পারছি না আমরা।

দিনলিপি: জেন্ডার সংবেদনশীলতার প্রশ্নে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম কোথায় অবস্থান করছে?

বন্যা মির্জা: বাংলাদেশের কোথাও, আমি একটু কড়া করেই বলতে চাই, আমাদের গোটা সমাজের কোথাও এই সংবেদনশীলতা দৃশ্যমান নয়। সংবাদমাধ্যমতো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, তাই সব সময়ই সেখানেও আমাদের একই বাস্তবতা ফেইস করতে হয়। আমার মনে হয় না যে জেন্ডার প্রশ্নে সংবাদমাধ্যম কোনও ইউনিক জায়গায় অবস্থান করছে। করলে হয়তো আমার ভালো লাগতো, সংবাদমাধ্যম এমন একটা জায়গা যেখানে নারী বা পুরুষকে আলাদা করার সুযোগ নেই। সবাইকে একইভাবে কাজ করতে হয় কিন্তু আদতে সেই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায় না।

দিনলিপি: সংবাদ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে, মানে ভাষার ব্যবহারেও কি সংবাদমাধ্যম আলাদা অবস্থান তৈরি করতে পারেনি? মানে সংবাদমাধ্যমের ভাষায় জেন্ডার সংবেদনশীলতার প্রশ্নটি কতোটুকু মীমাংসিত বলে আপনি মনে করছেন?

বন্যা মির্জা: পারেনি বলবো না, কেউ কেউ চেষ্টা করে যাচ্ছে, প্রায়শই ভুল হচ্ছে। এটাতো একটা চলমান প্রক্রিয়া, বহুদিন ধরে চলে আসছিলো, কেউ কেউ হয়তো বদলানোর চেষ্টা করছে। কেউ বলছে ভিক্টিম, রেপিস্ট। ‘ধর্ষিতা’ শব্দটার কথা যদি ধরি, তো আগে ধর্ষিতা বলা হলেও এখন ‘ধর্ষণের শিকার’ বলা হচ্ছে। তাই এটা আমাকে মানতেই হবে সংবাদমাধ্যমে বদলের একটা আভা অন্তত দৃশ্যমান। আসলে এটাতো চলমান একটা প্রক্রিয়া, বারবার নিজেকে শুধরাতে হয়। এই কাজটি তারাই করছেন যারা ভাষা ব্যবহারের প্রশ্নে জেন্ডার সংবেদনশীন। কিন্তু সবাই করছেন না। যারা করছেন না, তারা  আসলে এটা নিয়ে ভাবছেনও না। তবে কিছু সংবাদমাধ্যম আসছে তারা এটা পরিবর্তনের চেষ্টা করছে, ভাবছেন সংবেদনশীলতার সাথে।

দিনলিপি: ফেসবুকে বুকটক নামের একটা প্ল্যাটফর্ম চালান আপনি। সেটা সম্পর্কে একটু বলবেন।?

বন্যা মির্জা: খুব মজার একটা ব্যাপার। বই পড়ার একটা অভ্যাস আমার আছে, এটা একটা অভ্যাসের ব্যাপার। নেশার ব্যাপার। আমার শৈশবেই এই নেশা তৈরি হয়েছিল। বই পড়ে পড়ে আমি নিজের মতো করে রিভিউ লিখতাম। সেটা শেয়ার করতাম বন্ধুদের সঙ্গে। তো হঠাৎ একদিন আমার সহকর্মী মৌটুসি বিশ্বাস আমাকে প্রস্তাব দিল: ‘বন্যা আপা আপনি একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন।’ সেখান থেকেই বুক টক। আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটা গ্রুপ খুলি এবং বই নিয়ে আলাপ শুরু করি। আস্তে আস্তে অনেকেই আগ্রহী হতে থাকে।

দিনলিপি: এখন কী পড়ছেন?

বন্যা মির্জা: আমি মিলান কুন্ডারের জোক পড়ছি… ঠাট্টা… বাংলাটাই পড়ছি। আমার নিজের ভাষা যেহেতু বাংলা, তাই কোনকিছু পড়তে গেলে আমি আগে বাংলায় পড়ার চেষ্টা করি। পরে দরকার হলে ইংরেজি পড়ি।

দিনলিপি: আপনি তো একজন মঞ্চকর্মী। নাটক কি এখনও শ্রেণি সংগ্রামের হাতিয়ার?

ন্যা মির্জা: না, আমি তা বলি কী করে? কারণ, আমার নিজের দলের শ্লোগান ছিল নাটক হোক শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির বলিষ্ঠ হাতিয়ার, সেখান থেকে শ্লোগান হয়েছে… মানুষের জন্য নাটক। সুতরাং আপনি বদলটা বুঝতে পারছেন। আমরা কোনও ক্ষেত্রে আর রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট হতে চাই না।  ব্যক্তিগতভাবে আমি জগতে রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে কিছুই দেখতে পারি না। রাজনীতির বাইরে থেকে কোনও কিছু দেখা সম্ভব কি না সেটাও আমি নিশ্চত নই। শ্রেণি সংগ্রামের কথা কেউ আর বলতে চায় না। সেখান থেকে দূরে সরেছে মানুষ। আপনি সংবাদমাধ্যমের কথা বলেছিলেন, কেবল সংবাদমাধ্যমই নয়; এই ভয়, এই জুজুবুড়ি আমাদের অন্তরের অন্তঃস্থলে মস্তিষ্কের ভেতরে গেঁথে গেছে।  আমি জানি না এখান থেকে বের হতে পারব কিনা। তবে এই ভয় আমাদের সবাইকে গ্রাস করে রেখেছে।  কেউ অস্বীকার করতে চাইলে সেটা মিথ্যাচার হবে।

দিনলিপি: অভিনয় শিল্পি হিসেবে আপনি সবসময় সরব, বিশেষত নারী অধিকারের প্রশ্নে। আমাদের অভিনয় জগতে নারীর অবস্থান কী?

বন্যা মির্জা: আমি বলব, আলাদা কিছু না। তুলনামূলকভাবে মঞ্চে ভালো অবস্থা।  গ্রুপ থিয়েটার তো একটা আন্দোলন ছিল, একটা চর্চার বিষয় ছিল। এখনও তার খানিকটা রেশ থেকে গেছে। তো সেখানকার অবস্থা মোটামুটি ভালো। টেলিভিশনের ক্ষেত্রে যদি বলি, তো সেখানে সতর্কতার অভাব রয়েছে। একটা প্রডাকশনের মূলে রয়েছেন ডিরেক্টর। তিনি যদি চেষ্টা না করেন, অন্যদের জন্য কাজটা কঠিন হয়ে যায়। আমরা সচেতন নয়। সেটাও ঠিক। আমাদের খানিকটা অজ্ঞতাও আছে নারীবাদ নিয়ে।

দিনলিপি: সম্প্রতি অভিনয় শিল্পী সংঘের কার্যনির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আপনি। অভিনন্দন আপনাকে

বন্যা মির্জা: ধন্যবাদ

দিনলিপি: নির্বাচিত একজন সদস্য হিসেবে আপনার ভূমিকা কী হবে?

বন্যা মির্জা: যেহেতু অন্যরা এই পেশাটাকে অ্যাকনলেজ করতেই চান না, তাই সেই স্বীকৃতির প্রশ্নকে সামনে আনাই আমার প্রথম পদক্ষেপ হবে।  

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment