Uncategorized 

ছেলেধরা ও ডেঙ্গুর গুজব কথন এবং পাবলিকের ট্রল

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 3 মিনিট

চোর সন্দেহে রাজধানী ঢাকায় এক পোশাক শ্রমিককে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার পশ্চিম হাজিপাড়ায় গণপিটুনিতে মারা যায় দেলোয়ার নামের ওই শ্রমিক। বয়স হয়েছিল মাত্র পঁচিশ বছর। জীবনটা কেবল শুরু করেছিল ছেলেটা। ‘মব লিঞ্চিং’ তাকে সেখানেই থামিয়ে দিল। গাফিলতির কারণে সৃষ্ট ‘ছেলেধরা’ বিষয়ক গুজবকে যারা কেবলমাত্র ষড়যন্ত্র ছাড়া অন্যকিছু ভাবতে নারাজ, তারা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ‘চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে মৃত্যু’র এই খবরকে কী বলবেন?

লিখতে বসে সামাজিকমাধ্যমে ট্রল দেখলাম অনেক। ‘ছেলেধরা গুজবের মত ডেঙ্গুও গুজব’, এমনটা বলে নানাবিধ ট্রলের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন এক ‘দায়িত্বশীল’। স্বয়ং একজন মন্ত্রী বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের মত এডিস মশাদেরও প্রজনন ক্ষমতা বেশি’। সামাজিক মাধ্যম এই বক্তব্যকেও ছাড়েনি। ট্রলের কবলে পড়েছেন মন্ত্রী।

 বিশ্বাসযোগ্য কোন কথা নিয়ে ট্রল হয়েছে এমনটা কি খুব দেখানো যাবে? একমাত্র ‘ডগমাটিক’ ছাড়া অন্য কাউকে বিশ্বাসযোগ্য কোন বিষয়ে ট্রল করতে দেখা যাবে না। সুতরাং ট্রল যখন গণ আকারে হয়, তখন বোঝা যায় সেই ‘বক্তব্য’ বা ‘কথা’কে আমজনতা যাকে ইংরেজিতে বলে ‘ম্যাসপিপল’ বিশ্বাস করছে না।  তাই মুখ খোলার আগে দায়িত্বশীলদের চিন্তা করা উচিত, কোনো সিরিয়াস বিষয়ে অবিশ্বাস্য কথা বললে, তার সত্য কথাগুলোও এক সময় অবিশ্বাসের আওতায় পড়বে। চার্লি চ্যাপলিন সত্যিকার অর্থে কাঁদলেও মানুষ হেসে উঠতো, অবস্থাটা দাঁড়াবে তেমনি। তাই সত্যিটাকে অস্বীকার করে বা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা না করে স্বীকার করাটাই তুলনামূলক ভালো। এতে ‘হিতে বিপরীত’ হবার সম্ভাবনাটা অন্তত কমে যায়। এ কারণেই হয়তো বলা হয়, ‘কনফেস’ করাটা, যে করেন তার জন্যেই ভালো। 

বারবার বলেছি, সামাজিক শৃংখলা ভেঙে পড়েছে। মানুষের অবদমিত ক্রোধের প্রকাশ ঘটছে দুর্বলের উপর অত্যাচার দিয়ে। দুর্বল মানুষেরা নিজেদের উপর নানা অবিচারের বিপরীতে প্রতিশোধ স্পৃহার প্রকাশ ঘটাচ্ছে অপেক্ষাকৃত আরেক দুর্বলের উপর অত্যাচারের মাধ্যমে। ‘ইনজাস্টিস’ পরিণত হচ্ছে ‘মব জাস্টিসে’। এখনকার ‍দৃশ্যমান ‘মব জাস্টিস’র এই হলো মোদ্দা কথা।  

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত গত বুধবার দুপুরের একটি খবর: জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে তরুণ এক ভাই তার দশ বছর বয়সী বোনকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশালে। বোনের হাতে ধরা লিফলেটের মতন একটা কাগজ। এই বোনটি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তার বিচার চাইতেই তরুণ সে ভাই বোনকে নিয়ে প্রেস ক্লাবের সমুখে দাঁড়িয়েছেন। দাঁড়ানো তারা দু’জনেই, তাদের সঙ্গে আর কেউ নেই। 

কেন নেই, এই প্রশ্নটি এখন করা যায়। এর উত্তরের মধ্যেই রয়েছে ‘মব জাস্টিসে’র সুপ্ত অস্তিত্বটা। মানুষ ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে-হচ্ছে। মানুষ অত্যাচারিত হচ্ছে। নিজের ন্যায্য দাবি তুলে ধরতে গিয়ে উল্টো মুখোমুখি হচ্ছে বিপদের। অনেক সময় বিচার চাইতে গিয়ে নিজেই আসামি বনে যাচ্ছে। মিন্নির ক্ষেত্রে যা হয়েছে। এমন অবস্থায় একটি ভয়ের সংস্কৃতির আবহ গড়ে উঠেছে সামাজিক জীবনে।  যার প্রমাণ মিলছে বহুমাত্রিক পথে। 

সংবাদমাধ্যম উঠে এসেছে কেন মানুষ বিপদগ্রস্তদের উদ্ধারে এগিয়ে যায় না। একজন মানুষ হয়তো ছিনতাকারীর হাতে আহত হয়েছেন, তাকে হাসপাতালে নিতে গেলে নানা ঝামেলায় পড়তে হয়। পুলিশকে জানাতে হয়, হতে হয় সাক্ষী। অনেকেই বলেছেন, এমনটা করতে গেলে পড়তে হয় হয়রানিতে। ভালো কাজে পুরস্কারের বদলে কপালে জোটে হয়রানি এবং সাথে পরিবারের তিরস্কার। যার ফলেই মানুষ, নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে চায় না।

একদিকে নিজের উপর অবিচারের প্রতিকার না পাওয়া, অন্যদের উপকার করতে গেলে হয়রানির শিকার হওয়া, সব মিলিয়ে মানুষের মগজে সঙ্গতই বাসা বাঁধে ক্রোধের উন্মত্ততা। মনে হয়, সে দুর্বল বলেই তার উপর এমনটা হচ্ছে। তার মনে সঙ্গতই সবল হওয়ার প্রবল বাসনা জেগে উঠে। সাথে জেগে উঠে প্রতিশোধস্পৃহা। ফলে যখনই তারচেয়ে অপেক্ষাকৃত কোন দুর্বল পায় তখনই তার সেই ক্রোধ, প্রতিশোধস্পৃহা উগড়ে দিতে চায়। সে সময় বিবেক আর কাজ করে না। ক্রোধান্ধ মানুষদের যা হয়, হাতের সুখ মিটিয়ে মনের ক্রোধ মেটাতে চায় তারা। 

এবার ডেঙ্গুর কথায় আসি। এই মৌসুমে ঢাকা শুধু নয়, ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকার সরকারি-বেসরকারি কোন হাসপাতালেই সিট খালি নেই। সব ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীতে ভরে গেছে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে চিকিৎসকদের উদ্ধৃত করে খবর হচ্ছে, পরিসংখ্যান দেয়া হচ্ছে। চিকিৎসরা জানাচ্ছেন, এবারের ডেঙ্গু ভাইরাস তার আক্রমণের কৌশল পাল্টেছে। এখন রোগী হঠাৎ করেই শক সিনড্রমে আক্রান্ত হচ্ছে এবং সে কারণেই মৃত্যুর হার এবার বেশি। ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে। চিকিৎসকরাও এমন অবস্থাকে ভয়াবহ বলতে বাধ্য হচ্ছেন। 

কিন্তু দায়িত্বশীলরা এ সত্যটাকে স্বীকার না করে, ডেঙ্গুর খবরকেও গুজব বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছেন। বলছেন ডেঙ্গু নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ খবর করেছে, ‘রাজধানীতে রেকর্ড ছাড়িয়েছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা, জনমনে আতঙ্ক’। একদিনেই ঢাকার হাসাপাতালগুলিতে চারশ তিনজন রোগী ভর্তি হয়েছে এমন পরিসংখ্যানও দিয়েছে কাগজটি। তারপরও ডেঙ্গু সংক্রান্ত বিষয়কে যদি গুজব বলে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করা হয় তবে করার আর কী থাকে!

এমন সময়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আরেকটি কথা আলোচনায় এসেছে। তিনি বলেছেন, ‘মশা নিধন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়’! এখন যদি মশা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের আন্তঃকোন্দল শুরু হয় তাহলে তো মুশকিল। পৃথিবীতে বোধহয় আর কোনও দেশ নেই, যেখানে মশা বিষয়ে হাইকোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হয়, কথা বলতে হয়। যমুনা টিভি’র অনলাইনের শিরোনামটিই বলে দেয় আমাদের হকিকত। ‘কোনো সভ্য দেশে হাইকোর্ট মশা মারার জন্য আদেশ দেয় না, বললেন আদালত’, বুঝুন তাহলে অবস্থাটাটা! মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশন ও মেয়রের ভূমিকা বিষয়ে এমন কথা বলেন হাইকোর্টের দুই বিচারপতি। এরপরে আর কি কিছু বলার থাকে! তারপরেও যখন বলা হয়, তখন সেই কথা নিয়ে ট্রল ছাড়া আর কী হতে পারে!

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment