সহযোদ্ধার ভাবনাবিশ্ব 

চামড়া কি খাওয়া যায়, নাকি পুঁতে ফেলাই বিপ্লব?

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 3 মিনিট

চামড়া বিষয়ে একদল বলছেন, দাম যখন পাওয়া যাচ্ছে না, তখন প্রতিবাদ স্বরূপ মাটিতে পুঁতে ফেলুন। আরেকদল বলছেন, চামড়া খাওয়া যায়। তারা শিখাচ্ছেন চামড়া খাওয়ার প্রক্রিয়া। একদল বুদ্ধিজীবী রয়েছেন, তারা মুখ গম্ভীর করে জানান দিচ্ছেন, চামড়া রাষ্ট্রীয় সম্পদ তা পুঁতে ফেলা বা নষ্ট করা উচিত নয়। ইত্যাদিসব নছিহত শুনতে শুনতে জান অস্থির।

মনে হচ্ছে, যে জাতি সমস্যার স্বরূপ চিনতে ব্যর্থ হয়। প্রতিবাদের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করতে পারে না। নিজেদের বেঁচে থাকার স্বার্থে এক হতে পারে না। সম্মিলিত চিন্তা করতে পারে না। তাদের দিয়ে কী হবে! পোকারাও এক সাথে শব্দ তোলে, শেয়ালেরাও হুক্কাহুয়া। এরা কি পোকাদেরও অধম!

এই ভূখন্ডের লোকগুলো ওই গৃহস্থের মতন। যার ঘরে চোর ঢুকলো, তখন তার চিন্তার শুরু, দেখি বেটা কী করে। তারপর চোর আলমিরা খুললো, তাও একই চিন্তা। ঘরের জিনিসপত্র সব নিলো, তখনও সে ভাবছে, দেখা যাক। তার পরণের লুঙ্গিটিও খুলে নিলো, তার ভাবনায় তখনও, দেখি বেটা কী করে। যখন চোর বের হয়ে গেলো, তখন তার পিছু করতে গিয়ে গিয়ে দেখে পরনের লুঙ্গি নেই।

আরে ভাই, পাট গিয়েছে, চামড়া যাচ্ছে। এখন রয়েছে সেই গৃহস্থের মতন পরনের লুঙ্গিটা। অর্থাৎ পোশাক শিল্প। শেয়ার বাজার ‍লুট হয়ে গেছে আগেই। লোপাট হয়েছে খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকাও। ব্যাংকগুলো শূন্য হচ্ছে, বিপরীতে বাড়ছে সুইস ব্যাংকগুলোর কলেবর। একটি শ্রেণি ক্রমেই ফুলেফেঁপে উঠছে। সেকেন্ড হোম বানাচ্ছে মালোয়েশিয়া, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায়।

আমরা যখন ডেঙ্গুতে মরছি, তখন কেউ বিদেশে নিজের পরিবারকে রেখে আসছে। যাতে এডিস তাদের নাগাল না পায়। কেউ বিদেশ থেকে নানা ওয়াজ নছিহত করছেন। কেউ সেখান থেকে দেশের দুঃখে মরে যাচ্ছেন। কেউ আবার সেখান থেকেই উন্নয়নের আনন্দে বগল বাজাচ্ছেন। আর দেশে মারা পড়ছে আমজনতা মারিতে-মড়কে, দুর্ঘটনায়, আগুনে পুড়ে, আততায়ীর হাতে। 

দীর্ঘকাল আগে বিএনপির এক মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আল্লাহর মাল আল্লাহই নিয়া গেছে’। সাম্প্রতিকতার অনেক কিছু বিস্মৃত হলেও এখনো সেই কথাটি স্মরণে আছে অনেকজনের। ওই কথা নিয়ে এখনো ট্রল করেন কিছু মানুষ। অথচ এখন প্রতিদিন মানুষের মৃত্যুর খবর দিচ্ছে গণমাধ্যম, তা নিয়ে তাদের তেমন কোনো কথা নেই। তাদের আফসোস নেই, প্রতিবাদ নেই। তবে কি তারা শোক-দুঃখের উর্ধ্বে উঠে গেছেন। তারাও কি সেই মন্ত্রীর আপ্তবাক্য জপতে শুরু করেছেন, ‘আল্লাহর মাল আল্লাহই নিয়া গেছে’।

দিনাজপুরের এক ইয়াসমিন নিয়ে সারাদেশ তোলপাড় হয়ে উঠেছিল। ওমন তোলপাড়ে মনে হয়েছিলো দেশের মানুষের বিবেক বোধহয় জিন্দা আছে। আর কোন ইয়াসমিন হয়তো এমন করে হারাবে না। কিন্তু দৃশ্যপট পাল্টানোর সাথে সাথেই সব পাল্টে গেছে। এখন তো প্রতিদিন কত ‘ইয়াসমিনে’র খবর দিচ্ছে গণমাধ্যম। অনেক খবর চাপাও পড়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের সময় ‘ব্ল্যাক আউট’ মানে আত্মরক্ষা। এখন খবর ‘ব্ল্যাক আউট’ করে মাধ্যমগুলো নিজেদের রক্ষা করছে।

নব্বই দশকের এক তুখোর ছাত্রনেতাকে বলেছিলাম, বয়সের সাথে সাথে কি আপনাদের বিপ্লবেও ভাটা পড়েছে! উত্তরে বলেছিলেন, ‘দেখো তোমরা বিপ্লব বলতে বোঝো শুধু চিল্লাচিল্লি। নিরবেও বিপ্লব হয়। আর ভালো-মন্দের ব্যাখ্যাটা সবসময় এক থাকে না। কখনও ভালোটা খারাপ হয়ে উঠে, খারাপটাও ভালো। এসব চিন্তা করে অনেক কিছু মেনে নিতে হয়। সবাইকে খুশি করাতো আর সম্ভব নয়। এটাই বাস্তবতা।’ হায়রে বাস্তবতা! জমির আল ভেঙে সব সমানের চিন্তা এখন বাস্তবতা বোঝে!

অনেকক্ষণ সাত-পাঁচ বোঝালেন তিনি। প্রমান করতে চাইলেন, সাত আর পাঁচের যোগফল চৌদ্দ। আর আমি বুঝতে চাইলাম তার পরিবর্তন। এক সময়ের বিবর্ণ জিন্স আর চটি স্যান্ডেল পড়া বিপ্লবী, আর এখন স্যুটেড-বুটেড তেল চকচকে ভাঁড়ের পার্থক্য। মনে হলো এদের কথা শুনেই আমরা আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টাকে নষ্ট করেছি। হ্যাঁ, নষ্টই তো। না হলে, তাদের চেয়ে বেশি তেল চকচকে হওয়ার সুযোগ ছেড়েছি নির্দ্বিধায়। এখনো ভাবি, মানুষ বলতে একজন মানুষ নন। মানুষ মানে সম্মিলিত একটি সত্তা। মানুষ মানে একটি সমাজ, একটি রাষ্ট্র।

এরা বোধহয় রাষ্ট্র কাকে বলে তাও ভুলে গেছে। কিভাবে রাষ্ট্রের চিন্তা মানুষের মাথায় এলো তাও বিস্মৃত হয়েছে। রাষ্ট্রের কাজ বলতে মাথায় ঢুকে গেছে লুটেপুটে খাওয়া। রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে মানুষ সম্মিলিত ভাবে ভালো থাকার চিন্তায়। মতভেদের উর্ধ্বে উঠে যাতে একটি মৌলিক সমাজ তৈরি করা যায়, এমন চিন্তাতেই রাষ্ট্রের সৃষ্টি। সরকার যেখানে দলমতের হতে পারে, সেখানে রাষ্ট্র হবে দল বা মতের বাইরে। রাষ্ট্রের চিন্তা হবে মানুষের। এরা রাষ্ট্র আর সরকারের পার্থক্যও গুলে খেয়েছ ঝকঝকে মদিরার গ্লাসে।  

পুনশ্চ : ওরা গরুর গোশত খায়, রঙিন পানীয়ের সাথে। আর আমজনতা চিন্তা করে চামড়ার বিকল্প ব্যবহার। চামড়া কি খাওয়া যায়, নাকি পুঁতে ফেলাই বিপ্লব! খিদে পেটে কি বিপ্লব হয়? বিপ্লব কাকে বলে?

লেখক : কলাম লেখক ও সাংবাদিক।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment