সহযোদ্ধার ভাবনাবিশ্ব 

গণপরিবহন, স্বাস্থ্যবিধি, নগর পরিকল্পনা ও অহেতুক তত্ত্বের বাহাস

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 3 মিনিট

কিছু সোজা কথা আমরা বুঝি না। উদাহরণ দিই। এই যে ক’দিন ধরে অনেকে চিলাচ্ছেন, গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। লোকজন স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে বাসে চড়ছেন। ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব কথার সাকুল্যে কোন অর্থ নেই। নেই এ জন্যে যে, আপনি নগর পরিকল্পনা করতে পারেননি। ঢাকা একটি নগর হিসাবে গড়ে উঠেনি এবং দেশের কোন নগরই পরিকল্পিত হয়নি। না, আমি তত্ত্বকথা ঝাড়তে বসিনি। ও কাজ অন্যদের। তারা তত্ত্ব কথা এমন ভাবে ঝাড়েন যে সাধারণের মগজ তা নিতে পারে না। আর যারা ঝাড়েন তারাও সাধারণ মানে আমজনতাকে ধর্তব্যে নেন না। ফলে একটা গ্যাপ থেকে যায় তত্ত্বওয়ালাদের সাথে সাধারণের। এই গ্যাপ কমানোর কোন আগ্রহ দীর্ঘদিনেও দেখা যায়নি শুধুমাত্র তাত্ত্বিকদের কারণে। সহজ ভাবে বললে যদি তাদের কৌলিন্যের ধুতিতে টান পড়ে সে আশঙ্কাতে তারা সাধারণের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন, সাধারণ বয়ানকে দূরে রেখেছেন। সঙ্গতই তাদের সবকিছুই দুর্বোধ্য রয়ে গেছে। আর এই দুর্বোধ্যতাকে পুঁজি করেই আমজনতার মাথায় কাঁঠাল ভেঙেছেন উপরের মানুষরা। উপরের মানুষ চেনেন তো, নাকি তাও চেনেন না!

যাক গে, তত্ত্ববিদদের কথা আপাতত থাক, স্বাস্থ্যবিধি না মানার ঘটনাটা বলি। বুঝলাম নিয়ম করা হলো বাসে অর্ধেক যাত্রী তোলা হবে। ভালো কথা। যারা বললেন, তাদের কি হিসাবে আছে, কতজন যাত্রী বাসে যাতায়াত করেন? স্বাভাবিক দৃশ্যে বাদুড়ঝোলা অবস্থাতেও কতগুলো বাসের প্রয়োজন হয় যাত্রী পরিবহনে? সে অনুযায়ী বাসের নির্দিষ্ট সিটের অর্ধেক যাত্রী তোলা হলে, কতগুলো বাস লাগবে? আর অতগুলো বাস যদি দেয়া যায়, তবে কি রাস্তার দৈর্ঘ্য-প্রস্থে কুলাবে, না যানজটে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে দাঁড়াবে? আছে কি এসবের উত্তর যারা এই নিয়ম করেছেন এবং যারা স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না বলে চিলাচ্ছেন তাদের মগজে? নিশ্চিত নেই। থাকলে নগর পরিকল্পনা বলে কিছু একটা থাকতো। মুখে হয়তো বলা হয় আছে, সেটা মুখের কথাই। উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে গেলেই বোঝা যাবে কথাগুলো মুখের কিনা।

আপনি যে কথা বলবেন তার সাথে পিছে ও আগের সম্পর্ক থাকতে হবে। পেছনটা হলো আপনার ভিত্তি। ভিত্তি না গড়লে আপনি সামনেরটা গড়তে পারবেন না। এই সমন্বয় না থাকলে আপনার চিল্লাচিল্লি বৃথা। ঢাকা শহরের ফ্লাইওভার হয়েছে। আহা, একটা নগরে ফ্লাইওভার না থাকলে জাত যায় এই চিন্তাই প্রাধান্য পেয়েছে এসবের নির্মানে। সাথে মেগা প্রকল্পের মেগা পয়সা-কড়ির ব্যাপারতো রয়েছেই। আমাদের অবস্থা হয়েছে ‘খাল নাই তো খাল কাইটা পুল বানাও’ এর মত। ‘পুল’ মানেই প্রকল্প, আর প্রকল্প মানেই টাকা। আর টাকা মানেই বিমান ভাড়া করে দেশ ছাড়া। বিদেশে সেকেন্ড হোম।

আবার ধান ভানতে শিবের গীত শুরু করেছি। ফ্লাইওভারের কথা বলছিলাম। আচ্ছা ফ্লাইওভারের ফলে যানজট কতটুকু কমেছে তার কোন হিসাব-নিকাশ আছে কি? না, শুধু নিকাশই আছে, হিসাব নেই। ফ্লাইওভারে মূল রাস্তার জায়গা কতটুকু খেয়েছে? যেখানে ফ্লাইওভারের শুরু ও শেষ সেখানে অবস্থা এবং তার আশেপাশের সড়ক, গলি-উপগলির যানজট বেড়েছে না কমেছে, এসবের দৃশ্যমান অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কি কথিত নগরবিদরা কিংবা চিল্লানেওয়ালারা? প্রশ্ন থাকলো, উত্তরটা খুঁজে নিন নিজ গরজে। দেখবেন অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলে যাবে। চিল্লাচিল্লি করতে গেলে আর আওয়াজ বেরুবে না। আর তত্ত্ববিদরা মাথা চুলকাবেন।

এরমধ্যে একটি ভালো ঘোষণা এসেছে জনপ্রশাসনের তরফ থেকে। বলা হয়েছে অফিসে পঁচিশ ভাগের বেশি উপস্থিতি থাকতে পারবে না। এটা শুধু সরকারি তরফে। যদি বেসরকারি তরফে এমন ঘোষণা আসতো আরো ভালো হতো। ব্যাপারটি এমন হতো যদি আগামী দু’মাসের জন্য এমন ব্যবস্থা করা হতো, একটা অফিসে বা কারখানায় একশ জন লোক কাজ করেন। সেখানে পঁচিশ জন করে ভাগ করে দেয়া হলো। প্রতি পঁচিশ জন এক সপ্তাহ করে কাজ করবে। ফলে স্বাস্থ্য বিধি মানা হলো আর পঁচিশ জনের মাত্র মাসে এক সপ্তাহ কাজ করতে হলো, তিন সপ্তাহ ছুটিতে রইলো। ফলে তাদের বাইরে সাথে বের হতে হলো কম। গণপরিবহনে চাপ পড়লো না। শহরেও ভীড় বাড়লো না। অফিস বা কারখানাতেও সামাজিক দূরত বজায় রইলো। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যবিধিটা মোটামুটি লাইনে থাকলো। অর্থাৎ কাজকর্মও চললো, অফিস আদালতও চললো জরুরি ভিত্তিতে।

এই যে চিন্তা এরমধ্যে খুব বেশি তত্ত্বের বালাই নেই। এ হলো প্রয়োজনের তাৎক্ষণিক চিন্তা। এমন চিন্তার সাথে যদি এখন তত্ত্ব মিলাতে যান তাহলেই সর্বনাশের সাড়ে। আপনার আগ-পিছ ঠিক নেই যখন, তখন তত্ত্বের সূত্র মিলবে না এটা পরিষ্কার। আর সেই জন্যই অবস্থা অনযায়ী তাৎক্ষণিক সমাধান প্রয়োজন। আর তাৎক্ষণিক সমাধানটা দেয়ার জন্যই উপযুক্ত মানুষ দরকার। যে মানুষের অভাবেই চারিদিকে আমাদের হ-য-ব-র-ল অবস্থা। দোষারোপ আর চিল্লাচিল্লি। তত্ত্বের ফেরিওয়ালাদের অযথা বাহাস।

লেখক : কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।  

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment