Uncategorized 

ক্রান্তিকালে আমাদের চিন্তকগণ এবং তাদের বাহাস

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 3 মিনিট

করোনাকালে একটা কার্টুন দৃষ্টি কেড়েছে। আমার মতে চমৎকার এই কার্টুনটি অনেক বিষয়েই চিন্তা দাবি করতে পারে। কার্টুনটি এমন, ‘লকডাউনে ইঞ্জিনিয়ার স্বামীকে সব্জি কাটতে দিয়েছেন তার স্ত্রী। ইঞ্জিনিয়ার বলে কথা। স্বামী বেচারা তার সব যন্ত্রপাতি নিয়ে রীতিমত ইঞ্চি ইঞ্চি হিসাব করে মনোযোগ দিয়ে সব্জি কাটতে বসে গেছেন।’ অর্থাৎ তিনি তার পেশা অনুযায়ী মাপজোক করে সব্জি কাটার কোশেস করছেন। অথচ দা বা চাকু দিয়ে সহজেই সব্জি কাটা যেতো তা তার মাথায় ঢোকেনি। কার্টুনটা দেখে অনেকেই হয়তো হালকা হেসেছেন। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করেননি। দেখেননি সহজ ব্যাপারটি সেই কথিত মেধাবী ইঞ্জিনিয়ারের মাথায় ঢুকছে না। আমাদের সমাজেও এমন ইঞ্জিনিয়ার তথা চিন্তকদের দেখা মেলে যাদের মাথায় সহজ ব্যাপারটি সহজে ঢোকে না। একজন রিকশাওয়ালা যে ব্যাপারটি সরল ভাবে বোঝে, সেটি নিয়ে সেই চিন্তকরা দিনের পর দিন তর্কযুদ্ধ করেন। তত্ত্ব কথার ঝাঁপি খুলে বসেন। একজন সাধারণ মানুষের চিন্তাকে না বুঝে তারা সেই বেকুব ইঞ্জিনিয়ারের মতন সব্জি কাটতে রীতিমত যন্ত্রপাতি নিয়ে বসে যান। ফলে সাধারণ মানুষের চাওয়া আর চিন্তা উপেক্ষিত থেকে যায় তাদের কাছে। তারা থাকেন তাদের একাডেমিক চিন্তা নিয়ে। অথচ একাডেমিক চিন্তাটা কোথা থেকে আসে সেই উৎসই তাদের জানা নেই। মানুষের সাধারণ চিন্তা থেকেই একাডেমিক চিন্তার সৃষ্টি তা তারা ভুলে বসেন। আমাদের দেশের এই কথিত চিন্তকগণ মনে করেন, সাধারণ মানুষের চিন্তা আবার কী। আমরা একাডেমিশিয়ানরা যা চিন্তা করি তাই সঠিক।

তাদের ধারণা তারা সমাজনতন্ত্র বোঝেন, গণতন্ত্র জানেন। তারা মার্ক্স থেকে মার্কস গুড়া দুধ সব বোঝেন। সুতরাং সাধারণ মানুষের চিন্তা চেতনা বুঝে কী হবে। তারা যা বুঝবেন তাই মানতে হবে মানুষকে। তারা সব্জি কাটবেন স্কেল দিয়ে মেপে। যেন দু’এক মিলিমিটার এদিক সেদিক হয়ে গেলে মহা সর্বনাশ হয়ে যাবে। গণেশ উল্টে যাবে। অথচ তাদের ধারণা নেই সব্জি কাটায় এই মাপজোক কোন মানেই রাখে না। নিউটন না আইনস্টাইন কাকে নিয়ে যেন একটি কৌতুক ছিলো। তাদের কেউ মুরগির জন্য খাঁচা বানাচ্ছিলেন। বড় মুরগির জন্যে বড় খাঁচা, বাচ্চার জন্য ছোট খাঁচা। তখন বলা হলো, দুটো মুরগি তো এক খাঁচাতেই রাখা যায়। তখন নিউটন বা আইনস্টাইন বললেন কিভাবে? বলেই মাপজোক নিয়ে বসে গেলেন। আমাদের চিন্তকরাও তাই। তারা সবকিছুতেই মাপজোক নিয়ে বসে যান। আর অহেতুক বাহাসে সময় নষ্ট হয়, করেন।

মাঝেমধ্যে মনে হয় তারা কি মূলত সময় নষ্ট করার জন্যই বাহাসটা করেন, যাতে রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিলেনরা সময় পান। জানি না তাদের উদ্দেশ্যটা কী। না হলে তর্কের এত উদ্যোগ কেনো! তাদের যদি জিজ্ঞেস করি, মৃতকে চিৎ বা কাত করে শোয়ানোর মধ্যে লাভ লোকসান কী? না বা হ্যাঁ এর সহজ উত্তরের ধারে কাছে তারা যাবেন না। বসে যাবেন তারা চিকিৎসা বিজ্ঞানের সকল তত্ত্ব নিয়ে। অথচ ভুলে যাবেন মৃত্যুর পর মানুষ লাভ লোকসানের বাইরে চলে যায়। আমাদের চিন্তকদের বাহাসের অবস্থা এমনটাই। তাদের বাহাস রাজনীতি আর সমাজকে ক্রমেই মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ভিলেনদের ক্ষমতা। এক সময় যা সাধারণের লাভ লোকসানের বাইরে চলে যাবে। জানি না তখনো হয়তো আমাদের চিন্তকদের রাষ্ট্র নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে, অর্থনীতি নিয়ে, সমাজ নিয়ে বাহাস চালু থাকবে। কারণ তারা বাহাস করতেই ভালোবাসে। কেউ অভ্যাসে, কেউ স্বভাবে, কেউ উদ্দেশ্যে।

অনেকে বলেন, আমি রাষ্ট্র নিয়ে, সমাজ নিয়ে সর্বোপরি রাজনীতি নিয়ে কেনো লিখি না। লিখি না এই কারণে যে, আমি নতুন কোনো বাহাস সৃষ্টি করতে চাই না। অহেতুক, অর্থহীন কালক্ষেপন করতে চাই না। যেখানে বেশির ভাগ চিন্তক ‍নিজের দেশ-জাতি’র ন্যূনতম মঙ্গল চান না, শুধু চান বাহাসে জিততে সেখানে নতুন বাহাস তৈরি করা মানে বিপন্ন একটা রাষ্ট্র, একটা জাতির কাঁধে আরেক বহন অযোগ্য বোঝা চাপিয়ে দেয়া।

খুব সহজ একটি উদাহরণ দিই। সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর আলোকে সে উদহারণ। গণস্বাস্থ্যের কিটের পরিস্থিতিতো সবাই জানেন। সারা বিশ্ব র‌্যাপিড অ্যাকশন কিট নিয়ে কোভিড পরীক্ষা করছে। বাদ রয়েছি শুধু আমরা। অথচ আমাদের দেশেই তৈরি হয়ে আছে সে কিট। আমরা জানিও যে সে কিট কার্যক্ষম হবে। ইচ্ছা করলে যেটা দুদিনে করা সম্ভব, সেটা করতে করতে করতে আমাদের আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে সর্বোচ্চ অবস্থায় যাচ্ছে। সামাজিক সংক্রমনের ব্যাপকতার জন্য আলাদা করা যাচ্ছে না রোগীদের। এখন টেস্টের কোন রকম বিকল্প নেই। অথচ কী হচ্ছে, অনুমতির নামের আচার-উপচারের নানা ধাপ চলছে। অথচ দেশে চলছে স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে আইন প্রয়োগের, সিদ্ধান্ত নেয়ার। কিন্তু ওই যে বাহাস প্রিয় আমাদের দেশের চিন্তকেরা, বাহাসেই তাদের সব আগ্রহ। আর সব গোল্লায় যাক।

এই বাহাস থেকে, এই চিন্তকদের হাত থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত নিস্তার না পাওয়া যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত হয়তো আমাদের অবস্থার কোনোই পরিবর্তন হবে না। অথচ এই বাহাসকারীরা বলেন, তারা নাকি আমাদের অবস্থার পরিবর্তনের জন্যই বাহাস করছেন। হায় বাহাস, হায় আমাদের চিন্তকগণ।

লেখক : কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment