দিনলিপি 

সংবাদকর্মীর অভিজ্ঞতা: করোনা পজিটিভ মানেই অসুস্থ হওয়া নয়

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 3 মিনিট

একটা ছবি তোলার জন্য এর আগে কখনো এত অপেক্ষা করি নাই, করতে হয় নাই আসলে। এই যে করোনাকাল, এই যে করোনা নিয়ে এতকিছু— সেই করোনার কারণেই এই অপেক্ষা।

মূল খবর: দেশের অন্তত যে ১ লাখ ২ হাজার ২৯২ জন (অধিফদতরের নিয়মিত বুলেটিনের আজকের পর্যন্ত তথ্য) করোনায় আক্রান্ত হইছেন, তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম।

তবে খবরটা পুরনো। নতুন খবর (পুরাপুরি নতুন নাই আসলে): করোনামুক্তিও ঘটে গেছে। থার্ড স্যাম্পলের রেজাল্ট ‘নেগেটিভ’ পাইছি আসলে গতকাল। তারপর আগের ২৭ দিন যেই রুমে আইসোলেশনে ছিলাম, সেই রুম ডিজইনফেক্ট করার পর বাইর হইছি আজকে। সেলফিটা সেই ‘বন্দিত্ব’ অবসানের উদযাপন বলা যাইতে পারে।

এক বাসায় সবার থেকে আলাদা থাকার জন্য ২৮ দিন টু মাচ। তবে ‘ল অ্যাবাইডিং’ সিটিজেনের মতো আইসোলেশনটা মেইনটেইন করার চেষ্টা করছি যথাসাধ্য। সেই ঈদের আগ থেকে শুরু। এরপর গুনতে গুনতে এদ্দিন। এক্সপেরিয়েন্সটা সুখকর না। তবে আরও বিটার হইতে পারত, যদি ‘রোবট’ না হইতাম। শেষ পর্যন্ত ‘করোনাকাল’টা পার করা গেল, আপাতত সেই স্বস্তিতে আছি।

জ্বরের মাধ্যমে উপসর্গ শুরু। কোভিড পজিটিভ আসবে, এমন আশঙ্কা খুব একটা করি নাই। কারণ কর্মস্থল সারাবাংলায় ২২ মার্চ থেকে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ সুবিধা চালু থাকায় খুব একটা বের হইতে হয় নাই বাসা থেকে। কাঁচাবাজার, ওষুধপত্র কেনা আর এটিএম বুথ টাকা তোলার প্রয়োজন ছাড়া আসলে বেরও হই নাই। সেখানেও যথেষ্ট সতর্ক থাকছি, সেইটা বলা যায়। তারপরও তো সংক্রমণ ঠেকানো গেল না।

আমার উপসর্গগুলা মৃদু ছিল জন্য খুব একটা ভুগতে হয় নাই। শারীরিকভাবে ফিট ছিলাম। মানসিকভাবে তো বটেই। কারণ এই করোনা নিয়ে আমার যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং, তাতে সতর্ক ছিলাম, বাট এইটা নিয়ে প্যানিকড হওয়ার প্রয়োজন বোধ করি নাই। কোভিড পজিটিভ আসার দেখলাম, প্যানিকড হওয়ার প্রয়োজনও আসলে নাই। বরং যেইটা হইলো, যারা যারা জানলেন যে আমি কোভিড পজিটিভ, তাদের উদ্বেগটা ছিল অনেক বেশি। এবং ‘সরল’চিত্তে স্বীকার করতেছি, সেই উদ্বেগের ঠেলায় সকাল-বিকাল ফোন-মেসেঞ্জারের কমিউনিকেশন অনেক সময়ই ‘পেইন ইন অ্যাস’ হয়ে দাঁড়াইছিল।

ধরেন ঘণ্টাখানেক সময়ের মধ্যে যদি আপনাকে ৫/৬টা কল রিসিভ করা লাগে এবং প্রত্যেকটা কলে আসলে একই তথ্য রিপিট করা লাগে, সেইটা কাঁহাতক নেওয়া যায়! তবে সেটুক হজম করা লাগছে, করছিও। কারণ যারা উদ্বেগে ছিলেন, তাদের কোভিড বিষয়ক আন্ডারস্ট্যান্ডিং আমার মতো হবে, সেইটা তো আশা করা যায় না। আর তাদের উদ্বেগটা তো জেনুইন।

কোভিড পজিটিভ হওয়ার পর আইসোলেশনে চলে আসা ছাড়া বাকি কাজকর্ম আসলে স্বাভাবিক ছিল। রেগুলার অফিস করছি। কোভিড টেস্ট থেকে শুরু করে খোঁজখবর রাখা আর ফলোআপের পুরা বিষয়টাতে অফিসের সাপোর্টটাও ছিল উল্লেখ করার মতো। উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর থেকেই সহকর্মী রফিকুল্লাহ রোমেল ভাই সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখছেন। টেস্ট করানোসহ অন্য বিষয়গুলোতে আরেক সহকর্মী সৈকত ভৌমিককে কম জ্বালাই নাই। আর বাকি প্রত্যেকেই সবসময় খোঁজ রাখছেন সবসময়। প্রত্যেকের প্রতি কৃতজ্ঞতা। সহকর্মী ছাড়াও সাবেক সহকর্মী যারা জানছেন, বন্ধু-বান্ধব যারা জানছেন, সবাই খোঁজ নিছেন। তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা।

এত কিছুর মধ্যে কোভিড পজিটিভ হওয়ার খবরটা বাড়ি থেকে লুকাইছিলাম। কারণ বাংলাদেশের মোটামুটি বেশিরভাগ ‘পরিবারে’র মতো উনারাও অত্যন্ত টেনশনপ্রবণ, বরং একটু বেশিই হবে বোধ হয়। আব্বার শারীরিক অবস্থাও একটা বড় কারণ ছিল। সব মিলায়ে সিদ্ধান্ত নিছিলাম, কোভিড নেগেটিভ আসলে সবাইরে জানাব। এর মধ্যেও ড্যাডি, অর্থাৎ ছোট চাচা হাসিবুর রহমান শাপলা আর ছোট বোন হামিমা জেসমিন শাওন জেনে গেছিল। তারাও যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিল স্বাভাবিকভাবেই। সম্ভবত আমি নিজে ছাড়া আর সবাইই ওই রকম উদ্বেগে ছিলেন। উদ্বিগ্ন সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা।

বিশেষ একটা কৃতজ্ঞতা আছে। শিমু সুলতানা, ছোট বোইন, নিজের ছোট বোইনই বলা যায়। ডাক্তার হইছেন ‍উনি। তো আমার কোভিড ট্রিটমেন্ট উনি সামলাইছেন। এইরকম ছোট বোইন ডাক্তার হইলে সুবিধা আছে। নিয়ম করে সকাল-বিকাল মেসেঞ্জারে নক দিয়ে খোঁজ নিছেন।

তবে সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞতা সহধর্মিনী, অর্ধাঙ্গিনী বা উত্তমার্ধ— যেইটাই বলি না কেন, উনার প্রতি। উনিও বাসায় বসে অফিস করছেন। একটা পর্যায়ে গৃহ সহকর্মী চলে যাওয়ায় একইসাথে বাচ্চাকাচ্চা সামলাইছেন, রান্নাবান্নাসহ ঘরের বাকি কাজ সামলাইছেন, আমারে তো বটেই। এইটা নিঃসন্দেহে অমানবিক হইছে। দীর্ঘদিন ধরেই কৃতজ্ঞতার পাহাড় তার কাছে। সেইটা আরও উঁচা হইছে কোভিড সিচুয়েশনে।

তবে সারপ্রাইজিং ছিল মেয়ে দুইটা। উনাদের বয়স আড়াই বছর আর সাড়ে পাঁচ বছর। বাট দে বিহ্যাভড ভেরি ম্যাচিউরডলি। উনারা কৃতজ্ঞতা শব্দের অর্থ বুঝতে শিখলে জানবেন, বাবা উনাদের প্রতিও কৃতজ্ঞ।

যাউক, কোভিড টাইম ইজ ওভার। শেষ টাইমে আরেকটা কথা বইলা রাখি, অনেকেই কী ওষুধ খেয়ে করোনা সারাইতেছি, এইটা জানতে চাইছেন। এইটার উত্তর ব্যক্তিগতভাবে অনেকরেই দিছি। তবে এইটার একটা জেনেরিক উত্তর আছে, আপনার ডাক্তাররে সিদ্ধান্ত নিতে দেন যে উনি আপনারে কী ওষুধ দিয়া সারাইবেন। দরকার হইলে ডাক্তার চেঞ্জ করেন। বাট ডাক্তাররেই ট্রিটমেন্ট করতে দেন। যার যেইটা কাজ, তারেই নিশ্চয় সেইটা করতে দেওয়া উচিত।

শেষ কথা, ভালো থাকবেন সবাই। স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত বুলেটিনের রিপিটেশন মনে হইলেও বলতেছি— সতর্ক থাকেন, সাবধানে থাকেন, স্বাস্থ্যবিধি মাইনা চলেন। এরপরও যদি করোনায় আক্রান্ত হন, শরীর সুস্থ থাকলে ভয় পাওয়ার কিছু নাই। কারণ এই উপলব্ধিটা জরুরি— করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বা কোভিড পজিটিভ হওয়া মানেই অসুস্থ হওয়া নয়। বেশিরভাগ মানুষের জন্য করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ফ্লু বা সাধারণ জ্বর-সর্দির চাইতে বেশি কিছু নয়। কোমরবিডি থাকলে বেশি সাবধানে থাইকেন। দরকার হইলে ডাক্তারের সার্বক্ষণিক পরামর্শে থাকার চেষ্টা করেন। শারীরিক কিছু লক্ষণের কথা ডাক্তাররা বইলা থাকেন, সেগুলা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালেও যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। আর সবাইরে বলব— ইমিউনিটি স্ট্রং থাকে, সেই ধরনের খাদ্যাভ্যাস বা জীবনাচরণ ফলো করেন। বিয়িং প্যানিকড উইল নট হেল্প ইউ ইন অ্যানি ওয়ে!

লেখক: সংবাদকর্মী, সারাবাংলা.নেট-এ জয়েন্ট নিউজ এডিটর পদে কর্মরত।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment