কাব্য গাহন 

কবি ও কবিতা

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 2 মিনিট

ছদ্মনামে লেখার একটা মজা আছে। আগে বুঝতাম না, সুনীলের মতন কবিও কেনো নাম ভাঁড়িয়ে লিখতেন। সামাজিকমাধ্যমে আমার একটা প্রোফাইল রয়েছে, যাতে আমি ছদ্মনামে লিখি। এই প্রোফাইলটা আমাকে সেই বোধের জায়গাটা খুলে দিয়েছে। কদিন আগে একজন কবিকে ইনবক্সে জানালাম, তার ভুলের একটা জায়গা। তিনি গায়ে মাখলেন না। বরং নানা ভাবে প্রমান করার চেষ্টা করলেন তিনি লিখিয়ে হিসেবে অনেকটাই বড়। হাসলাম তার ছেলেমিতে।

আমি সবসময় বলি, কবি হওয়ার আগে সাজাটা ঠিক না। গতবারের বই মেলায় একজনকে বলেছিলাম, ভাই এই যে আপনার কাঁধে ঝোলা, পায়ে চটি, এর সাথে কবিতার কী সম্পর্ক? উনি জবাব দিতে পারেন নাই। সত্যিই কি ঝোলা আর চটির সাথে কবিতার কোনো সম্পর্ক আছে? নেই।

কবিতা লিখতে গেলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যে যোগ্যতার সেটা হলো স্বতস্ফূর্ততা। কবিতা মূলত বুদ্ধি লিখে না, লিখে হৃদয়। কবিতা কখন আসবে তা কেউ বলতে পারেন না। কবিতা এসে যায়। প্রবন্ধ লিখতে যেভাবে চিন্তা করতে হয়, ঘাঁটতে হয়, কবিতায় মূলত তা হয় না। কবিতা কলম বা কিবোর্ডের কি-তে এসে থাকে। লিখা হয়ে যায়। শেষ হবার পর কবি নিজে বিস্মিত হন তার সৃষ্টিতে। একটি সত্যিকার কবিতা প্রথমে বিস্মিত করে কবিকে। তার আনন্দ ঝলমলে চোখ প্রশ্ন করে, এটি কি আমার লিখা! এটাই কবিতা। যাকে ইনবক্সে জানান দিয়েছিলাম, তিনি তার ধারকাছেরও কেউ নন।

আমি কবিকে তিন ভাগে ভাগ করি। কবি, নষ্ট কবি ও কষ্ট কবি। কবিতো কবিই। নষ্ট কবি হলেন, যিনি নিজের প্রতিভার অযথা অপচয় ঘটান। কবির বদলে হয়ে যান স্তাবক। এ সময়ে এমন অনেকের দেখা মেলে। আর কষ্ট কবি হলেন, যার লিখার ইচ্ছা আছে, কিন্তু উৎস নেই। তিনি টেবিলে বসে কাটাকুটি করে কিছু একটা দাঁড় করান এবং তাকেই চালাতে চান কবিতার নামে। এমন অসংখ্যজন আমাদের আশেপাশেই আছেন।

গত বই মেলায় দেড় হাজারের মতন ‘কবিতার বই’ প্রকাশিত হয়েছিলো। তাদের প্রায় সবাই নতুন। আশ্চর্য হতে হয় সংখ্যার আধিক্যে। কবিতার বইয়ের চেয়ে প্রকৃত কবিতার সংখ্যা ছিলো কম। কথাটা রূঢ় এবং ক্রূর হলেও ভেবে দেখলে অন্তত মিথ্যা মনে হবে না। না, আমি বলছি না, প্রকৃত কবিদের সব লেখাই কবিতা। তবে তাদের অনেকগুলোই কবিতা। সেই অনেকগুলো কবিতা ‘কষ্ট কবি’দের নেই।

কেনো বই বের করেন তারা, এটা আমাদের কাছে এক সময় উৎসুক প্রশ্ন ছিলো। আজ বুঝি, একটি প্রকাশনা স্থানীয় ভাবে তাকে একটা পরিচিতি দেয়। পরিচিত মহলে নামের পেছনে একটি পদবি যোগ হয়। ‘কবি’ পদবি। লোকজনকে ‘অটোগ্রাফ’ সহযোগে একটি বই দেয়া যায়। বলা যায়, এবার বই মেলায় বেড়িয়েছে। একধরণের আত্মতৃপ্তি। যে তৃপ্তিতে মূলত ‘আত্ম’টা থাকে না, থাকে মুখোশ। কবির মুখোশ। হায়, মুখোশের কবি, আহা, কষ্ট কবি।

পুনশ্চ : বলে রাখি, সেই প্রোফাইলটায় আমি যা ইচ্ছা লিখি। এমনটা করি ইচ্ছা করেই। মাঝেমধ্যে নিজেরও ‘কষ্ট কবি’ হতে ইচ্ছে হয় বলে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment