সহযোদ্ধার ভাবনাবিশ্ব 

এরশাদ, গার্ডিয়ান ও বাস্তবতা

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 2 মিনিট

এরশাদকে নিয়ে বৃটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ানে লিখেছেন ডেরেক ব্রাউন। এরশাদের সময় গার্ডিয়ানের হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তাই তার পর্যবেক্ষণ অবশ্যই গুরুত্বের দাবি রাখে।

ডেরেক ব্রাউনের লেখাটার বাংলা অনুবাদ ছাপিয়েছে দৈনিক মানবজমিন। লেখার শুরুটার সাথে আমি এতটাই একমত যে, সরাসরি সেই অংশটুকুই তুলে দিলাম। ব্রাউন লিখেছেন, ‘স্বৈরাচাররা যেমনটা হয়ে থাকেন, হোসেন মুহম্মদ এরশাদ ততটা নৃশংস ছিলেন না। তার শাসনামলে বাংলাদেশ ত্রাস, কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের জনপদ ছিল না। তবে দেশটা ছিল এমন যেখানে সর্বত্র যেন সন্দেহ ও নৈরাশ্যের ছাপ। দুর্নীতি পৌঁছে গিয়েছিল দেশের প্রতিটি কোণায়। ভঙ্গুর রাজনৈতিক কাঠামো আরও ন্যুজ্ব হয়ে গিয়েছিল।’ ডেরেক ব্রাউনের পর্যবেক্ষণ এবং তুলনাশক্তি অসাধারণ।

এরশাদবিরোধী আন্দোলন আমার নিজ জীবনাধারাকে বলতে গেলে প্রায় উল্টো ধারায় প্রবাহিত করেছিল। ইচ্ছা ছিল চিকিৎসক হবার, কিন্তু আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ রাজনীতির স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। হলাম ছাত্রনেতা। কিন্তু ছিয়াশির নির্বাচনকে ঘিরে শুধু রাজনীতি নয়, রাজনীতিকদেরও চিনতে শুরু করলাম। দেখলাম চরিত্র বদলের খেলা। তারপর নব্বই-এর গণঅভ্যুত্থান। দেখলাম, গণতন্ত্রকে বকরি বানিয়ে তাকে ধুয়ে, জবাই করে কেটেকুটে খাওয়ার পালা। আজ অবধি তাই দেখছি। তাই রাজনীতিক আর হওয়া হলো না। ঢুকে গেলাম সাংবাদিকতায়। আছি তাতেই। তাই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া অংশটার যে কোন পর্যবেক্ষণে চোখ আটকে যায়। যেমন গিয়েছে ডেরেক ব্রাউনে।

ডেরেক ব্রাউন তার ভাষ্যে আটাশির নির্বাচনের কথা বলেছেন। কিন্তু এড়িয়ে গেছেন ছিয়াশির নির্বাচনের কাহিনি। যেখানে এরশাদের দল জাতীয় পার্টি আসন পেয়েছিল ১৫৩, আওয়ামী লীগ ৭৬ ও জামায়াত ১০টি। ভাগাভাগির এ নির্বাচন বাদ পড়ে গেছে ডেরেক ব্রাউনের লেখায়। যা কিছুটা হলেও লেখার আঙ্গিকটাকে অসম্পূর্ণ করেছে।

তবে ডেরেক ব্রাউন আটাশির নির্বাচন নিয়ে একটি মূল্যবান কথা বলেছেন। সে সময়ের গণমাধ্যম ও কূটনীতিকদের আলাপচারিতায় সে নির্বাচনে ভোটের টার্নআউট যে মাত্র দুই শতাংশ ছিলো তা তিনি জানিয়েছেন। তিনি সেই ভোটকে স্রেফ জোচ্চুরি হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। ভোট স্বাভাবিক ও নিয়মিত দেখাতে শ্রমিকদের ভাড়া করা হয়েছিল। ঢাকার একটি কেন্দ্রে দুপুরেই নির্বাচনী কর্মকর্তা শতভাগ ভোট পড়েছে এমন ঘোষণা দিয়েছিলেন অথচ সেই কেন্দ্রের ব্যালট বক্স রাজপথে পোড়াচ্ছিলেন ভোট বিরোধীরা। দায়িত্বপালনের এমনসব অভিজ্ঞতার কথাও লিখেছেন ডেরেক ব্রাউন। সে সময়ের, সেই আন্দোলনের কর্মী হিসাবে বলছি; ডেরেক ব্রাউন সত্যটাকেই তুলে এনেছেন। সত্যের এই খণ্ডচিত্রটাই ছিল সে সময় সারাদেশের পূর্ণচিত্র।

এরশাদের দেখানো পথটাই আজ আরও প্রশ্বস্ত হয়েছে। এরশাদ যে বিষবৃক্ষের চারা লাগিয়েছিলেন, তা কালের পরিক্রমায় পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষে রূপ নিয়েছে। হয়েছে বিষময় ফলে-ফুলে পল্লবিত। সে হিসাবে এরশাদকে নিশ্চিত ‘পাথ ফাইন্ডার’ বলা যায়। আমাদের মতোন যারা এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নিজের ভবিষ্যত উৎসর্গ করেছিলেন, তাদের কাছে বড় জানতে ইচ্ছে করে আপনারাও কি ডেরেক ব্রাউনের মতোন ভাবেন? না আপনারাও সেই ডান বা বামপন্থীদের মতন, যাদের কর্মীরা নির্যাতিত হয়েছেন, গুলি খেয়েছেন সেই আন্দোলনে, তাদের কথা ভুলে শোকবার্তা জানান।

রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধা কেন বৃদ্ধি পাচ্ছে দিনকে দিন। কেন মেধাবীরা রাজনীতিতে আসছেন না, এমন প্রশ্ন শুনি প্রায়শই। অনেকে লেখেনও এমন কথা। তাদের বলি, মেধাবী আমি, আমরাও ছিলাম। সেই মেধার প্রার্থিত ভবিষ্যতকে উৎসর্গ করেছিলাম আন্দোলনে, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের আশায়। আমাদের সেই আশা কি পূর্ণ হয়েছে? তবে, মেধাবীরা কেন আসবে রাজনীতিতে? বরং যারা এসেছিলেন তাদের অনেকেই ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ বলে পালিয়ে বেঁচেছেন। কারণ ‘জিরো জিরো সেভেন নয়ন বন্ড’ ও তাদের গডফাদারদের সামনে মাথা বাঁচানোই তো মুশকিল হয়ে উঠে। আর মাথা না থাকলে তো মেধার তো কোন অস্তিত্ব নেই। সুতরাং রাজনীতিতে এসে নিজের মাথা হারানোর তো কোন মানে হয় না। রাজনীতি শুধু নয় মেধাবীদের কাতার বেঁধে দেশত্যাগের কারণও এই।

যা লিখলাম এটা রূঢ় বাস্তবতা। বামদের কচলানো রাজনীতির তত্ত্ব আর ডানদের চাপাবাজি হয়তো এই লেখায় নেই। প্রয়োজনও নেই। আমাদের টার্নআউটটা দরকার। আমরা কেন রাজনীতি করবো, সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তরটা জানা দরকার।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।  

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment