দিনলিপি 

এবার দাদা সাতেপাঁচে থাকতে হবে, বারান্দা থেকে নামতে হবে

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 2 মিনিট

নোয়াখালীর নারী নির্যাতনের ঘটনায় অনেককেই দেখলাম ‘ক্রসফায়ার’ চাইতে। এখানে দুটো প্রশ্ন রয়েছে। কেন চান, কার কাছে চান? প্রথম প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। বিচার ছাড়া একজনের মৃত্যু কোন অধিকারে চাচ্ছেন আপনি, তা ভেবে দেখেছেন কি? জানি দেখেননি। ভেবে দেখেছেন কি, আপনি বিচারে আস্থা হারিয়ে একটি বিচারহীন সমাজ ও রাষ্ট্র তৈরি করতে চাচ্ছেন? জানি, দেখেননি। এই যে বিচারহীনতা, এটা একদিনে তৈরি হয়নি। এই বিচারহীনতা আপনি নিজে তিলে তিলে তৈরি করেছেন। এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও সমাজ আপনার তৈরি। বলবেন তো, আমার কী করার আছে। আপনার পাশের জনও একই ধুয়া ধরবেন। আমার কী করার আছে!

উল্টো প্রশ্ন করি, কী করার নেই আপনার, আপনাদের। কী করেছেন আপনি। বাচ্চারা সড়ক ঠিক করতে রাস্তায় নেমেছিলো, আপনারা রুদ্রনীল ঘোষের কবিতার মতন, বারান্দা থেকে নামেননি। আমাদের তরুণ খবরকর্মীরা রাস্তায় মার খেয়েছেন। দেখে আবার রুদ্রনীলের মতন বলেছেন, ‘আমি বাপু সাতেপাঁচে থাকি না’। তা আপনি থাকেন কিসে? পেঁয়াজের দাম বাড়ে, ঝাঁজের কান্না চেপে বাজার সেরে বাড়িতে ফেরেন। চাকু ঠেকিয়ে মানিব্যাগ নিয়ে যায়। বলেন, কপালে ছিলো। হ্যাঁ, আপনাদের কপালে তো তাই থাকবে। থাকা উচিত।

মেয়েটা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। মোড়ের চায়ের দোকানে বসে বলবেন, ‘চালচলন ভালো ছিলো না, এমন তো হবেই।’ ছেলেটাকে ধরে নিয়ে গেছে। বাঁকা ঠোঁটে চিবিয়ে বলবেন, ‘বড় বাড় বেড়েছিলো দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকে। বাবার দেয়াল নাকি। ঠিক হয়েছে।’ বেঠিকটা তখই হয়, যখন আপনার ছেলের রাতের বাড়ি ফেরার রাস্তা গিয়ে উঠে লকাপে। বন্ধুদের সাথে গিয়েছিলো একটু ‘ইয়ে’র ফ্ল্যাটে। আহা, ডাহা মিথ্যা অভিযোগে ধরে নিয়ে গেলো। এখন যদি মিথ্যা অভিযোগ হয় তাহলে মেয়েটার যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার বিপরীতে কেন বললেন, চালচলন ভালো ছিলো না! কেন বললেন, গ্রাফিতি আঁকা ছেলেটার বড় বাড় বেড়েছিলো! তো এখন প্রশ্ন করি, বলি; এগুলোতেই করেছেন। নিজেদের পায়ে কুড়োল মেরেছেন।

এই যে প্রতিবাদ না করে উল্টো তাল দিয়ে গেছেন, সেই তাল এখন আপনার মাথায় পড়ছে। সারাদেশ ক্রমেই নোয়াখালী আর সিলেট হয়ে উঠছে। ও, বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। সিলেটের ঘটনা নোয়াখালীর নিচে প্রায় চাপা পরে গেছে। হয়তো আরেকটা ঘটনা নোয়াখালীকেও নিচে ফেলে দেবে। আপনারা প্রতিদিন ধারাবাহিকের নতুন এপিসোড দেখবেন। আর মোড়ের দোকানে চা-পান খেতে খেতে কার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করা যায় দেখবেন।

এই আপনারাই বিচারহীন সমাজ তৈরি করেছেন। অসহায় রেনুকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে মেরে বীরত্ব দেখিয়েছেন। সামান্য মোবাইল চুরির অপবাদে কিশোরকে গাছে ঝুলিয়ে দিয়েছেন। আহা আপনাদের বীরত্বের তুলনা ভূ-ভারতে নেই। নমস্য আপনারা। এখন আব্দার তুলেছেন ‘ক্রসফায়ারে’র। আহা, কী আব্দাররে ভাই।

এক ওসি প্রদীপই দুশো’র  ‍উপরে ক্রসফায়ার দিয়েছেন এমনটাই বলছে গণমাধ্যম। চারিদিকে দেখুন তো কতজন ‘ফায়ারড’ হয়েছেন। এখন যেমন করোনাকালে খবরকর্মী, পাটকলের কর্মীরা ‘ফায়ার্ড’ মানে চাকরি হারাচ্ছেন। এটাও এক ধরণের ‘ক্রসফায়ার’ হঠাৎ নয় ক্রমমৃত্যুর কাছে সঁপে দেওয়া। প্রথমে মানসিক ভাবে মরো, তারপর শারীরিক ভাবে। করোনাকালের প্রথমে যেমন চিকিৎসকদের নকল মাস্ক দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিলো। সে কথাতো ভুলে বসে আছেন। জানি, আপনারা সাতেপাঁচে থাকেন না। তাই ‘টু শব্দটিও’ করেন না। তাহলে কোন অধিকারে ‘ক্রসফায়ার’ চান! কেন চান?

অনেক আগে থেকেই বলে আসছি, ‘ক্রসফায়ার’ কোনও সমাধান নয়। একজনকে সরিয়ে দিলে দশজন সে জায়গা পূরণ করতে চাবে। চাচ্ছে। কক্সবাজারে কি ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে? যায়নি তো। যাবে না। ব্যবস্থাকে সংস্কার করতে হবে। যে ব্যবস্থা রাষ্ট্র চালায়। যে ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে নিপীড়ক করে তোলে। সে ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। বলি, ভাই কিংবা দাদা সাতেপাঁচে না থেকে কোনো লাভ হচ্ছে কি? আগে ছিলো বিপদ রাস্তায়। এখন শুধু ঘরে নয় বেডরুমে ঢুকে পড়ছে। আপনার বেডরুম আপনাকেই নিরাপদ রাখতে হবে ভাই অথবা দাদা। রাস্তার নিরাপত্তাই দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। আর বেডরুমে। দিল্লিরে দাদা বা ভাই বড় ‘দূর অস্ত’। অতএব এ যাত্রায় বারান্দা থেকে নামতেই হবে। ওই যে এইডসের বিজ্ঞাপনে বলে না, ‘বাঁচতে হলে জানতে হবে’। দাদা বা ভাই তাই বলি, ‘বাঁচতে হলে নামতে হবে’। সাতেপাঁচে থাকতে হবে। কোনও উপায় নেই। উপায়ের রাস্তা আপনি ও আপনারাই বন্ধ করেছেন।

কাকন রেজা: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment