সহযোদ্ধার ভাবনাবিশ্ব 

এই দুর্যোগের কালে অন্যকে ট্রল করার আগে আয়নায় নিজেকে দেখে নিন

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 2 মিনিট

সামাজিকমাধ্যমে হৈচৈ বেধে গিয়েছে ঈদের মার্কেট নিয়ে। রীতিমত আহাজারি গেলো গেলো বলে। এমনটা না হলেই তারা যেনো বেঁচে যেতেন করোনার কবল থেকে। অক্ষম মধ্যবিত্তদের আর্তনাদে ভারী হয়ে গেছে ভার্চ্যুয়াল আকাশ। মানুষজনের বাড়ি ফেরা আর কেনাকাটার ভিড় তাদের এই আর্তনাদের উৎস। হ্যাঁ উৎস, কারণ নয়। কারণ হলে তারা মানুষকে দায়ি না করে সিস্টেমকে করতেন। তাদের হাহুতাশ ঘরে থেকেই। আপাতত নিরাপদে থেকেই। যেহেতু তাদের ঘরে আরো কয়েকদিনের খাবার রয়েছে, চলার সঙ্গতি রয়েছে। বাইরে যাবার প্রয়োজন এখনো হয়নি। তাই রসদ ফুরানোর আগ পর্যন্ত তারা এমন আর্তনাদ করেই যাবেন। অবশেষে যখন রসদ ফুরাবে তখন অতি বিপ্লবী হয়ে উঠবেন। যদিও এখনকার আহাজারির মতন সেই বিপ্লবের খুব একটা প্রতিফলন ঘটবে না সামাজিকমাধ্যমে। চোটপাট জমা থাকবে মাথার ভেতরেই। সামাজিকমাধ্যমে লিখে ফ্যাসাদে পড়ার মতন অতটা সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারেনি এই অক্ষম মধ্যবিত্তগণ। তাদের চোটপাটের লক্ষ্যবস্তু হলেন তাদের চেয়ে একধাপ নিচুতে থাকা নিম্নবিত্ত মানুষ। যাদের সারাদিন খোঁচালেও ‘রা’ করবে না। তারা অনেকটা মরার মতন। মরাকে মেরে যমন লাভ নেই, নড়ে না। তারা ঠিক তেমনটাই। এদের মূল চিন্তা ক্ষুধা নিবারণ। নিজ পরিবারকে নিয়ে পেটেভাতে বেঁচে থাকা। অক্ষম মধ্যবিত্তদের মত স্বপ্নবিলাসী নয় এ মানুষগুলো। এদের স্বপ্ন বেঁচে থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

অক্ষম মধ্যবিত্তরা উচ্চবিত্তদের লাথি খেয়ে সেই ক্ষোভ ঝাড়ে এই নিম্নবিত্তদের উপর। তাই তারা বাড়ি ফেরা আর মার্কেটে এসব দরিদ্রদের ভিড় নিয়ে গেলো গেলো বলে আর্তনাদ করে উঠে। অথচ এই নিম্নবিত্তদের সারা বছরের আনন্দ জমে থাকে দুটো ঈদকে ঘিরেই। দুটো ঈদে তাদের পরিবারের লোকজন নতুন কাপড় পায়। সেই কাপড়েই চালিয়ে নিতে চায় বছরের বাকি দিনগুলো। আর তাদের বাড়ি ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা অক্ষম মধ্যবিত্ত কী বুঝবে। উচ্চবিত্তদের সাথে অসম প্রতিযোগিতার লড়াই তাদের বাড়ি ফেরার আনন্দটাই ভুলিয়ে দিয়েছে। আর এক শ্রেণির রাজনৈতিক ফটকাবাজ যারা হঠাৎ করেই দুর্নীতির বরপুত্র হয়ে উঠেছে, তাদেরতো নিজস্ব কোন ঠিকানাই নেই। তারা কোন বিত্তের সেই পরিচয়টাই তাদের ঠিক করা হয়ে উঠেনি। এরা কি বুঝবে বাড়ি ফেরার মানে।

আচ্ছা যারা বাড়ি ফেরা নিয়ে কথা বলছেন, তাদের বলি। বলুনতো, এই নিম্নবিত্তের মানুষগুলো শহরে থেকে কী করবে? বন্ধ কারখানা, বেতন নেই, বস্তির ঘরের ভাড়া পরিশোধের চাপ। তারা কী করে থাকবে শহরে! আর থাকলেও বা লাভ কী? তারা করোনায় আক্রান্ত হলে কী তাদের চিকিৎসা জুটবে? হাসপাতালে জায়গা হবে? প্রাইভেটতো দূরের কথা কোনো সরকারি হাসপাতালেও কি সিট মিলবে তাদের? নিদেনপক্ষে তারা আক্রান্ত কিনা সেটা নিশ্চিতের জন্য পরীক্ষার গ্যারান্টি কি কেউ দিতে পারবেন? পারবেন না। তাহলে তারা শহরে থেকে কী করবে? অসহায় মানুষ অজান্তেই নিজের উৎসের দিকে যেতে চায়। মৃত্যুর মুখোমুখি মানুষ তাদের আপনজনের কাছে ছুটে যায় সে কারনেই। আপনি তার বাঁচার নিশ্চয়তা দিতে পারবেন না, এমন কী শান্তিতে মৃত্যুও নিশ্চিত করতে পারবেন না, তখন তাদের বাড়ি ফেরা নিয়ে ট্রল করাও আপনার সাজে না। সাজে কি?

অক্ষম মধ্যবিত্তদের কাছে প্রশ্ন রাখি। আপনি যে অন্যকে ট্রল করছেন, আপনি আক্রান্ত হলে কী করবেন? আপনার পাশের বাড়ির মানুষটি বা আপনারই কোনো আত্মীয়স্বজনই, যিনি শুধুমাত্র করোনায় আক্রান্ত কিনা তা জানার জন্য সকাল থেকে অসুস্থ শরীরে লাইনে দাঁড়িয়ে। তবু তিনি পরীক্ষা করতে পারছেন না। চিকিৎসার প্রশ্ন পরে, সে যে আক্রান্ত সেটা জানতেই মানুষ মরে যাচ্ছে। একজন চিকিৎসক হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন না। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ঘুরে ঘুরে প্রাণ দিচ্ছেন অ্যাম্বুলেন্সে। এ অবস্থায় আপনি ট্রল করছেন আরেকজনকে। আপনার নিজের ভেতরের আয়নাটার পারদ কি উঠে গেছে? সত্যিই দুর্যোগের এই করোনাকালে আপনাদের মত অন্ধদের জন্য করুণা হয়। নিজের অধিকারটাই বুঝে উঠতে পারেননি অথচ খুঁজতে বসে গেছেন অন্যের ভালোমন্দ। বলিহারি আপনাকে।

লেখক : কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment