দিনলিপি 

আপন কাহন

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 2 মিনিট

`Close your eyes and try to see’ গানের এই কলি শুনেই হুমায়ূন আহমেদে’র মাথায় এসেছিলো মিসির আলি চরিত্রটি। যিনি দেখার চেষ্টা করেন চোখ বন্ধ করে। এটা হুমায়ূন আহমেদে’রই ভাষ্য। বলেছেন, ‘মিসির আলির কথা’ বলতে গিয়ে। আমিও নিজেও আমার কথা বলতে গিয়ে কেনো যেনো হুমায়ূন আহমেদকে টেনে আনি। হয়তো নিজের অক্ষমতার জন্যই তার উপর ভর করা। তার মতো করে বলতে না পারার জন্যই তাকে টেনে আনা। চোখ বন্ধ করে দেখার বিষয়ে আমার একটি কবিতা রয়েছে। মূলত বস্তবাদকে খোঁচা মেরে লেখা। যার প্রথম লাইন ছিলো, ‘চোখের বাইরে নেই কোনো অচিন নগর’। আসলেই কি চোখের বাইরে কোনো অচিন নগর নেই, দৃষ্টি যতটা যায় ততটাই সত্যি, এর বাইরে আর কোনো সত্যি নেই!


মিসির আলি’র কাছে অব্যাখ্যাত কোন কিছু নেই। তিনি তার লজিক দিয়ে সব কিছু ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করেন। মিসির আলি বড় লজিক্যাল চরিত্র। হুমায়ূন আহমেদও হয়তো সেই লজিক দিয়েই সব ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন। বলা যায় নিশ্চিত ব্যর্থ হয়েছেন, না হলে হিমুর সৃষ্টি হতো না। লজিক দিয়ে আসলে সব কিছু ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তেমনি হিমুর মতন এন্টিলজিক্যাল ক্যারেক্টার ক্রিয়েট করাও খুব সহজ কথা নয়। লজিক যেখানে থেমে গিয়েছে সেখানেই হুমায়ূন আহমেদ বাধ্য হয়ে ‘হিমু’র স্মরণাপন্ন হয়েছেন। আমিও হই, আমার ভেতরের হিমু’র। লজিকের বাইরে অনেক কিছুই রয়েছে তার প্রমান স্বয়ং আমি। সেটাও লিখবো। আপাতত সেই লেখার বিষয়টি রয়েছে মিসির আলি’র কাছে। নিজের ভেতরে বসে থাকা মিসির আলি সেটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছেন। তার দেখা শেষ হলেই লিখবো। জানাবো, লজিকের বাইরে অর্থাৎ চোখের বাইরেও থাকে অচিন নগর। দৃষ্টির সীমা যেখানে শেষ, সেখানেই সব কিছু শেষ নয়। অসীমের কাছে সেটা সামান্যই মাত্র।  


দুই. 
হাঁটছি একাকি। গন্তব্য নেই, কোথাও যাবো জানা নেই, হাঁটছি। মধ্য দুপুরের সূর্য মাথার উপর। চোখে চশমা থাকায় টের পাচ্ছি না। না, রোদ চশমা নয়। ‘ফটোসান’ বলেন দোকানিরা। রোদের তেজ বুঝে যে চশমার কাচ স্বচ্ছ থেকে কালো হয়ে উঠে। আহা এমন চশমার কাচের মতন মন বুঝতো যদি মানুষ। একজনের বিষাদে অন্যজনের মুখ বিষন্ন হয়ে যেতো। চোখে জমতো বাষ্প। কখনো তা থেকে মেঘ। মেঘ থেকে বৃষ্টি। দৃষ্টির কার্নিশ বেয়ে দু’ফোটা অশ্রু। আহা, কত ভালো হতো। 
গন্তব্যহীন যাত্রা কাদের জন্য। যাদের বয়স শেষ, করার কিছুই নেই। আর যাদের মধ্য বয়সে তরুণ সন্তানের মৃত্যু ঘটেছে তাদের জন্য। আমার যাত্রা শেষের ক্যাটাগরিতে। মধ্য বয়সে উপযুক্ত সন্তান হারানো আর মৃত্যুর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এমন জীবনের কোনো গন্তব্য থাকে না। প্রতিটা পিতাই সন্তানের মধ্যে বেঁচে থাকতে চান। সেই সন্তান না থাকলে, পিতার বেঁচে থাকা মৃত্যুরই মত। যে মৃত্যু ‘শ্যাম সমান’।  
তরুণ লেখকেরা চান তার বাবা যেনো তার লেখাটি পড়েন। হুমায়ূন আহমেদ তার শঙ্খনীল কারাগারের পাণ্ডুলিপির কথায় কত আনন্দ নিয়ে লিখেছেন, পান্ডুলিপিটি তার বাবা পড়ে যেতে পেরেছিলেন। কষ্ট ছিলো, তার প্রকাশিত কোনো উপন্যাস বাবার পড়া হয়ে উঠেনি। তার আগেই তিনি চলে গিয়েছিলেন অনন্তধামে। আমার বাবা আমার লেখা অন্তত কাগজে যা প্রকাশিত তার কিয়দংশ পড়ে যেতে পেরেছিলেন। বাবার চলে যাবার দুঃখ পোষাতে বড় ছেলের উপর ভর করেছিলাম। ও ছিলো আমার লেখার বড় ক্রিটিক সাথে অনুরাগীও। বাবার না পড়ার দুঃখ সয়ে গিয়েছিলো ছেলের পড়ে নেয়াতে। বরং কষ্ট ক্রমেই আনন্দে রূপ নিচ্ছিল ছেলের যোগ্যতায়। এত ভালো ক্রিটিক আর অনুরাগী পাওয়া যে কোনো লেখকের পক্ষেই সৌভাগ্যের। কিন্তু ওই যে, চোখের বাইরেও রয়েছে অচিন নগর। সেই নগরে কী পরিকল্পনা চলছে তা ছিলো আমার সসীম চিন্তার অসীমে। সেই অচিন নগরের অধিকর্তার অসীম চিন্তা-ইচ্ছা জানার মতন আমার কোনো যুক্তি আর প্রযুক্তি ছিলো না। আমাকে অসহায়, মৃতেরও অধিক করে ছেলেটা চলে গেলো সেই অচিন নগরে, যেখান থেকে ফেরে না কেউ। যোগাযোগের বাইরে কল্পনার অধিক কল্পনায়। এ নগরের সকল প্রযুক্তিই ব্যর্থ ছিড়ে যাওয়া সেই যোগাযোগ জোড়া লাগাতে। অচিন সে নগরের খোঁজ জানা নেই ক্ষুদ্র মানুষের। 


সুতরাং আমার এই মধ্য দুপুরের যাত্রা গন্তব্যহীন। হয়তো বা কোনদিন নিরুদ্দেশেরও। 

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment