Uncategorized দিনলিপি 

আজ একুশে, শহীদ দিবস : আজ আমার ফাগুন চলে যাবারও নয় মাস

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 4 মিনিট

একুশে ফেব্রুয়ারি আনন্দ না শোকের! মাঝেমধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে উঠি। একুশের আগের বিকেলে মোড়ে মোড়ে ফুল বিক্রির সমারোহ। ভিন্নজনের সাথে আলাপে যতটা জানা গেছে, রাজধানী থেকে মফস্বল সব জায়গাতে একই অবস্থা। নিজের চোখে না দেখলে বোধহয় একটু দ্বিধা থেকে যেতো। ফুলের দোকানে বড় বড় গোলাপের পাশাপাশি ফুলের ক্রাউন। প্রশ্ন করলাম বেচা-বিক্রি কেমন? বললো, ভালো। ফুলের ক্রাউন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। ওই যে, উৎসবে মেয়েরা মাথায় যেটা দেয়। সাথে গোলাপ, যা সাধারণত বান্ধবীদের জন্যে। বিস্মিত হতে গিয়েও ভালো লাগলো ফুল বিক্রেতার হাসিমুখ দেখে। অন্তত এ দিনটি উপলক্ষে তার ট্যাঁকে তো কিছু টাকা ঢুকবে। না হলেতো পাচার হয়ে যেতো বিদেশের কোনো ব্যাংকে।

একুশ তারিখ, ফাগুন মাস। আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। একটু পরেই ভোর হবে, প্রভাতফেরি নামবে পথে। আমার ফাগুনের চলে যাবারও আজ নয় মাস। এমন ভোরেই সে বেড়িয়েছিলো বাসা থেকে, আর ফেরেনি। আবার মনে করিয়ে দিই। ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন, ফাগুন রেজা। একজন গণমাধ্যমকর্মী, ইংরেজি বিভাগের সাব-এডিটর হিসাবে যে কর্মরত ছিলো। একুশ তারিখেই, গত বছরের একুশে মে গুপ্তঘাতকের হাতে প্রাণ দিতে হয় তাকে। ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরতে গিয়ে নিখোঁজ হয় সে। পরে তার দেহ পাওয়া যায় জামালপুরের কাছাকাছি রেললাইনের ধারে। আজ পর্যন্ত তার মূল খুনি বা খুনিরা ধরা পড়েনি। কেনো পড়েনি সেটাও খুনের মতন আরেকটা রহস্য। সময় এলে সেটাও বলা যাবে।

যাকগে, ফাগুন নামের কথা বলি। ওর দাদা, মানে আমার বাবা ছিলের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। স্কুলের নবম বা দশম ক্লাশে পড়তেন তখন তিনি। সে সময়েই নামেন আন্দোলনে। তার নামে হুলিয়া জারি হয়। সেই দ্রোহের ফাগুনকাল স্মরণেই সেই দাদার নাতির নাম রাখা হয় ‘ফাগুন’। নামটা রেখেছিলেন তার দাদি। যিনি রাজনীতি থেকে সামাজিক কাজ সবকিছুতেই ছিলেন অগ্রগামী। এমন পরিবারের ছেলেই ফাগুন। অন্যায়ের সাথে আপোষ যার ধাতে ছিলো না। সে আপোষ করেনি। নিরাপোষ সেই আগুনসম তরুণকে তাই সরিয়ে দিয়েছে কোনো আততায়ী হাত, যার পেছনে হয়তো রয়েছে কোনো রহস্য। যা চাপা পড়েছে হয়তো ফাগুনের মৃত্যুর সাথেই।  

ফাগুন খুব খেপে যেতো। গত একুশেও সে রেগে গিয়েছিলো। রাতে আমাকে ফোনে বলছিলো, ‘আব্বুজি, একুশ এখন উৎসব হয়ে গেছে। একুশেতে ফুল কেনা হয় বান্ধবীর জন্য, শহীদদের জন্য নয়। শুধুমাত্র কিছু মানুষ কেনে শ্রদ্ধার জন্য, অন্যরা নিজেদের ফায়দা হাসিলের জন্য। প্রদর্শনের জন্য।’ ফাগুনের প্রশ্ন ছিলো, ‘দাদুবাবা, তাদের যে ত্যাগ, তার মূল্য কী রইলো?’ সে যে নেই, তাতো তোর না থাকার মধ্যেই বুঝিরে বাবা। তুই ঠিকই বুঝেছিলি, শুধু বুঝি না আমরা, আর আমাদের ‘ডগমাটিক’ এবং ‘ক্যানিবাল’ সমাজ। ওহ, ফাগুন তার দাদাকে ‘দাদুবাবা’ এবং দাদিকে ‘দাদুমা’ বলতো। মূলত উনারাই ফাগুনকে বড় করেছিলেন, উনাদের আদর্শই ধারণ করছিলো ফাগুন। আমার চেয়েও বেশি অনুসরণ করতো সে তাদের। আদর্শে, চলনে-বলনে।

ফাগুনের আগুনে পুড়ে সত্যিকার মানুষ হয়ে উঠছিলো আমার ছেলেটি। নির্ভিক, সত্যাশ্রয়ী এবং নিঃসন্দেহে সৎ। কোনো কমিটমেন্ট রক্ষায় কখনো পেছ-পা হয়নি সে। সে হোক প্রফেশন, বন্ধুত্ব কিংবা পরিবার, যে কোনো ক্ষেত্রে। চাকরিতে যোগ দেয়ার আগে, বিশেষ প্রয়োজনে বোধহয় কোনো বন্ধুর কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করতে হয়েছিলো ওর। দেয়ার নির্ধারিত দিনের দু’দিন আগে আমার কাছে টাকা চেয়েছিলো। বলেছিলো, সময়ের একদিন আগে দিয়ে দিলে কথার দামটা আরো বেশি করে থাকবে। এক্ষেত্রে পুরো ওর দাদুমা’র মতন হয়েছিলো ফাগুন। এগুলো খুব মনে রাখতো। আর আমি এর উল্টো, শুধু ভুলে যাই। আর ঋণ রয়ে যায়। যখন মনে পড়ে, তখন বিব্রত হই। হয়তো আমার এ ভুলটা দেখেই ও শিক্ষা নিয়েছিলো। নিজে বিব্রত হতে চায়নি। আজ আমি ওর সফলতা থেকে শিক্ষা নিতে চাই।

ফাগুনের নিজের ইচ্ছা ছিলো ইংরেজি সাহিত্য পড়ার। কিন্তু বাংলার প্রতি ছিলো অসীম মমতা। বঙ্কিম থেকে হুমায়ূন আহমেদ, আবুল মনসুর আহমেদ থেকে আহমদ ছফা, সবই ওর পড়া ছিলো। শেষ পড়ছিলো পলাশীর উপর লিখা অন্যরকম একটি ইতিহাস। যা পলাশী নিয়ে চিন্তার আরেকটি দিক খুলে দিতে পারে। আমারও পড়া ‍উচিত ছিলো বইটি। কিন্তু হাত দিতে সাহস পাই না। ও পাতা মুড়ে রেখে গিয়েছিলো, ফিরে এসে পড়বে বলে। বইটি সে অবস্থাতেই রয়েছে। আমি ওর মোড়ানো পাতা খুলে দেখার সাহস অর্জন করতে পরিনি, হয়তো পারবোও না। জানি ও ফিরবে না। তবুও মোড়ানো পাতা যেনো অজান্তেই প্রতীক্ষার যাতনাটা ধরে রাখে। এই যাতনা উৎরে যাবার কোনো উপায় জানা নেই আমার।

এত ভালো ইংরেজি জানতো ফাগুন। ওর এক সিনিয়র কলিগ সেদিন জানাচ্ছিলেন, ফাগুন উনাকে বলেছিলো, আইএলটিএস-এ আট তোলা কোনো ব্যাপারই না। উনি পরীক্ষাটা দিতে চাচ্ছেন, সেজন্যেই ফাগুনের কথা মনে পড়েছিলো তার। এ সত্বেও ফাগুনের বাংলার প্রতি ছিলো অসম্ভব অনুরাগ। বাংলা নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বললে অসম্ভব রেগে যেতো সে। চলে যাবার আগে শুদ্ধ বাংলা লেখার প্রতিও যত্মশীল হয়েছিলো। ইংরেজির বাইরে টুকটাক বাংলাতেও লিখতে শুরু করেছিলো সে। কিছু বাংলা রিপোর্টও করেছিলো তখন।

জার্নালিজম ওর পড়ার বিষয় ছিলো না। কিন্তু তার রিপোর্টিংয়ের ধরণ এবং লেখায় খুব ভুল ধরার কিছু ছিলো না। এমনকি ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিংয়েও নিজের দক্ষতা দেখিয়েছিলো ফাগুন। সেটাই হয়তো, ওর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রান্ত’র মৃত্যু নিয়ে রিপোর্টিংটাই তার প্রোজ্জ্বল উদাহরণ। অনেককে টপকে সত্যটা বের করে এনেছিলো ফাগুন। জানি না, তবে হতে পারে সে সত্যই ওর চলে যাবার সম্ভাব্য কারণও। খবর প্রকাশ বা সংগ্রহের প্রচেষ্টার কারণে সাংবাদিকের উপর হামলা-মৃত্যু, এসব এদেশে অনেকটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। সাগর-রুনি’তো উদাহরণ হয়েই আছে। রয়েছে আরো অনেক দৃষ্টান্ত। তাতে কী হয়েছে! থেমেছে কি মৃত্যুর মিছিল? থামেনি। এমনকি সঠিক বিচারের সম্ভাব্যতা রয়ে গেছে অনেক ক্ষেত্রেই অধরা।

একজন বলছিলেন, আপনার ছেলেকে ‘এ লাইনে’ দিলেন কেনো। আমি এ কথার উত্তরে কী বলি। ও-কে তো আমি দিইনি। ফাগুন নিজেই চলে গিয়েছে। হয়তো এটাই ছিলো ওর রক্তের ধারাপাত। পরম্পরা রাখতেই গণমাধ্যমে পা রেখেছিলো সে। আমার ইচ্ছে ছিলো না একেবারেই। কারণ আমি জানি এই পথ কতটা বিপদসংকুল। কিন্তু ওই যে নিয়তি। বাপ-দাদার ধারাবাহিকতা তাকে টেনেছিলো গণমাধ্যমে এবং মৃত্যুর দিকে।

ফাগুন না হয় মরে গেছে, গণমাধ্যম কি জীবিত? বোধহয় না। সাগর-রুনি থেকে ফাগুন রেজা, কারো মৃত্যুই কি গণমাধ্যমে তেমন কোনো মাতম সৃষ্টি করতে পেরেছে। সিএনএন’র এক রিপোর্টার কে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন ট্রাম্প, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর নৃপতি। পেরেছিলেন কি সেই রিপোর্টারকে ঠেকিয়ে রাখতে, পারেননি। সে হোয়াইট হাউসে প্রবেশের অধিকার আদায় করে নিয়েছিলো। সেই সাংবাদিকের নিজ মাধ্যম এবং অন্যান্য গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্টরা মিলে দাঁড়িয়েছিলো সেই রিপোর্টারের পাশে। আর আমরা এবং আমাদের গণমাধ্যম- এমন প্রশ্ন করতেই এখন গ্লানিবোধ হয়। আর প্রশ্ন করেই লাভ কি, মৃত বা মৃতেরা কোনো উত্তর দিতে পারে না। শুধু পারে প্রশ্ন রেখে যেতে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও হত্যার শিকার হওয়া সাংবাদিক ফাগুন রেজার বাবা।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment