যে ঘটনা খবর হয়নি 

অসংখ্য মানুষের ভিড়ে মিশে যাওয়া এক বাবার গল্প

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 2 মিনিট

এই ছবিটার পেছনে মানে ক্যামেরার পেছনে একটা গল্প আছে। সব ছবির পেছনেই আরেকটা গল্প থাকে।

বাসে করে ঢাকায় ফিরছিলাম। পাশের সিটে এক ভদ্রলোক বসা। বাবু বাজার ব্রিজে এসে যানজটে থেমে আছে বাস। নড়াচড়ার নাম নাই। আমি বিরক্ত। তখন জানালা দিয়ে নদীর ছবি তুললাম। আমার পাশের সিটে জানালার পাশে বসা মধ্য বয়স্ক সহযাত্রীটি বলে উঠলেন- ‘উঠছে ছবি দেখি?’ একটু আড় চোখে তারে একবার দেখে নিয়ে তারপর দেখালাম। উনি দূরে কৃষ্ণচূড়া ফুল দেখিয়ে বললেন, ‘ফুলের ছবি আসে নাই’। তাকে সন্তুষ্ট করতে একটু জুম করে কৃষ্ণচূড়াসহ একটা তুললাম। এবার- বললো ‘এইতো আসছে। সুন্দর…’
তারপর আমরা চুপ। প্রচন্ড গরম। বাস চলে না। এই গরমে লোকাল টাইপ বাসে যানজটে বসে থাকার কী যন্ত্রনা এটা একমাত্র বাসযাত্রীরাই বুঝবে।
নিচ দিয়ে হকার ডেকে যাচ্ছিলো- এই পানি পানি…। ওই লোকটি পানিওয়ালাকে ডেকে, এক বোতল লেমন পানীয়র দাম জানতে চাইলেন। হকার জানালো ৩০ টাকা। পকেটে হাত দিয়ে ৩০ টাকা বের করে বললেন, ‘নাহ বেশি দাম। যাও মিয়া…।’ তারপর আমার দিকে ফিরে হাসি দিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, ‘তারচেয়ে এই ৩০ টাকা পোলাপানরে খাওয়াইলে কাজ হইবো’। মানে তিনি তার সন্তানদের কথা বলছিলেন। আমি যথারীতি পাত্তা না দেয়ার ভঙ্গিমায় কালো সানগ্লাসটায় চোখ ঢেকে সোজা তাকিয়ে আছি।
আমার সেই সহযাত্রী জানতে চাইলেন- কই যাবেন? বললাম গুলিস্তান। উনি বললেন আমিও গুলিস্তান…তারপর সাভার যাবো। আমি আর কোন কথা বাড়ানোর আগ্রহ দেখালাম না। গরম বাড়ে। আমাদের ঘাম ঝরে। বাসটি একটু নড়ে উঠে আবার থামে। আরেকজন হকার উঠে। উনি (পাশের সে যাত্রী) তার দিকে তাকায়… হকার ডাকে- ‘ঝাল দিয়া চানাচুর।’ আমি ভাবি উনি বোধহয় এইবার কিনে খাবেন। উনি কিনলেন না। আমি যথারীতি সোজা তাকিয়ে থাকি। কয়েক মিনিট এভাবে পার হয়। তারপর আরেক হকার উঠলো ঠান্ডার চকলেট নিয়ে। হকার ডাকছে- ‘খাইলে ঠান্ডা ভালো হবে, গলা পরিষ্কার রাখবে, তৃষ্ণা মিটবে…! লোকটা উৎসুক ভাবে তাকায়। আমি মনে মনে খুব করে চাইছি উনি কিছু একটা হলেও কিনে খাক…। আমি সানগ্লাস চোখে তাকিয়ে আছি সোজা। উনি যথারীতি হকারের আসা যাওয়া দেখলেন। মাঝে শুধু বললেন- উফ গরম। বাবু বাজার ব্রিজ তখনো আমরা পার হতে পারিনি। এবার আইসক্রিম ওয়ালা উঠলো। …এই আইসক্রিম লাল সবুজ অরেঞ্জ-লেমন আইসক্রিম…। লোকটা বাচ্চাদের মতো আইসক্রিমওয়ালার দিকে তাকিয়ে আছে। আর আমি সোজা তাকিয়ে আছি। লোকটা আমার বাম পাশে বসা জানালার কাছে। আর ডান পাশের খালি সিটে এসে আইসক্রিম ওয়ালা আইসক্রিম বলে ডাকছে। লোকটা তাকিয়েই আছে ওই দিকে। একজন আইসক্রিম কিনলো। সবুজ একটা আইসক্রিম। লোকটা আমার দিকে তাকালো। কেন তাকায় বুঝলাম না। আমি তাকিয়ে আছি সোজা। আর মনে মনে গাইছি সঞ্জীবদার গান ‘ওই পাথরের চোখে সানগ্লাস’। বাস নড়ে ওঠে। আইসক্রিমওয়ালা নেমে যায়। লোকটা আর আইসক্রিম কেনে না। আমি সানগ্লাস চোখে সোজাই তাকিয়ে থাকি। কিছুক্ষণের ভেতরই বৃষ্টি নামলো। লোকটা হেসে উঠে আমাকে অবাক করে দিয়ে বাচ্চাদের মতো বিড়বিড় করে বললো ‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে…’ লোকটা জানালা দিয়ে হাত বাইরে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে…!
মিনিট ২০ পর আমরা গুলিস্তান পৌঁছাই। উনি আগে নামলেন। আমি একটু পরে নামবো। লোকটা যাওয়ার সময় আমাকে বলছিলেন- ‘ভাতিজা সরো নামবো’। আমি তাকে নামতে দিলাম। আমার কানে বাজছিলো তার ওই কথাটি- ‘তার চেয়ে ৩০ টাকা পোলাপানরে খাওয়াইলে কাজে লাগবে।’ লোকটা একজন বাবা। তখনো গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পরছে…। ওই লোকটা গুলিস্তানে অসংখ্য রকম গল্পের ভেতর মিশে গেলেন, মিলিয়ে গেলেন অসংখ্য বাবার ভিড়ে। এইসব গল্প আমাদের ক্যামেরার পেছনেই থাকে। এইসব গল্প ক্যামেরার সামনে আনতে নেই। রাষ্ট্রের অবমাননা হবে। অনেকে বিব্রত হয়।

লেখক: তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment