দিনলিপি 

অফিসে ঢুকে ফাগুনকে হুমকি দিয়ে গিয়েছিল ডেভেলপার কোম্পানি

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 4 মিনিট

গত বছরের ডিসেম্বরে প্রিয়.কম ছেড়েছি। পেরিয়ে গেছে ছয়টি মাস। এই কয়েক মাসে অনেকেই ছেড়ে গেছেন এ প্রতিষ্ঠানটি। আবার রয়েও গেছেন অনেকে। এই অনলাইন নিউজপোর্টাল ছাড়ার পর সাবেক সহকর্মীদের আর একসঙ্গে পাইনি। তবে গত শনিবার (২৯ জুন) পেয়েছিলাম তাদের অনেককে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে। বিকেল ৩টায় মানববন্ধনকে সামনে রেখে সবাই এক এক করে আসছিলেন। অনেক দিন পর দেখতে পেয়ে কারও কারও মাঝে সে কি আনন্দ!

এ সময় প্রিয়.কমের সহকর্মীদের মধ্যে যারা আসেননি, ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন তাদের একজন। হত্যার শিকার হওয়া ফাগুনের জন্যই সেদিন আমরা সম্মিলিত হয়েছিলাম। সেদিন ওখানে আরেকজন এসেছিলেন, নাম কাকন রেজা। তিনি ফাগুনের বাবা। তার সামনে যখন দু-একজন হুটহাট একে অপরকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠছিলাম, তখন তার নিশ্চয় ডুকরে কেঁদে উঠতে মন চাইছিল। চাপা কান্নায় ভরা বাবা-হৃদয় নিশ্চয় বলছিল, ‘আমার ফাগুন বেঁচে থাকলে সেও নিশ্চয় এরকম প্রতিবাদে সামিল হতো!’

কিন্তু হায়! হায়েনারা ফাগুনকে বাঁচতে দেয়নি। গত ২১ মে ঢাকার একটি অনলাইন নিউজপোর্টালে সাক্ষাৎকার শেষে বাড়ি ফেরার পথে তরুণ সাংবাদিক ফাগুনকে হত্যা করা হয়। নির্মমতার শিকার হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া সেই ফাগুনের জন্মদিন ছিল গত ১ জুলাই (সোমবার)। এমন দিনে আনন্দ বিহব্বল হওয়ার কথা থাকলেও ফাগুনের বাবা, মা, ভাই, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, পরশী, সহজনরা নিশ্চয় বিষাদে প্রতিটি ক্ষণ পার করেছেন। মা হয়তো নারী ছেড়া ধনের কথা ভেবে খেতে বসে খাবার হাতে নিয়ে নিথর বসেছিলেন, ফাগুনের বয়সী অন্য কাউকে দেখলেই আর্তনাদ শুরু করেছেন। বাবা কাকন রেজাও হয়তো এমন কিছুই করেছেন।

দুই.

আমি প্রিয়.কম ছেড়ে দেয়ার মাস ছয়েক আগে এই নিউজপোর্টালের ইংরেজি বিভাগে যোগ দেয় ফাগুন। ওর নামটাই আমার কাছে অদ্ভুত সুন্দর লেগেছিল। দেখলাম, বেশ মিশুক ছেলে। খুব সহজেই অন্যের হৃদয়ে তার প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে পারে। ওর সঙ্গে আমার সখ্য হয়েছিল খুব অল্পদিনে,  হৃদ্যতা গড়ে উঠতেও সময় লাগেনি।

অফিসে যখনই ফাগুনের সঙ্গে দেখা হতো অদ্ভুত হাসিমাখা ভঙ্গিতে করমর্দন করতে হাত এগিয়ে দিতো। ওর হাত সবসময় ঘামতো, ঠাণ্ডা হয়ে থাকত। ওর হাট ধরলেই একটা শীতল শান্তির ধারা অনুভূত হতো মনে। ফাগুন বলত, ‘দাদা, আমার হাত সবসময়ই এরকম।’ ওর সেই হাসি, কথা বলার ও হাত বাড়িয়ে দেয়ার আন্তরিক অঙ্গভঙ্গি এখনও চোখে লেগে আছে। 

এর মধ্যে একদিন অফিসে প্রবেশ করেই শুনলাম ঝামেলা হয়েছে। অফিসে একটি ডেভেলপার কোম্পানির লোকজন এসে ফাগুনকে হুমকি দিয়ে গেছে। ফাগুন ইংরেজি বিভাগে সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দিলেও বাংলা বিভাগের জন্য একটি সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। নির্মাণাধীন একটি ভবনের লম্বা রড পড়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কারণ ছবিসহ ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরেছিল। প্রতিবেদনটি সরিয়ে নেয়া না হলে ফাগুনের পরিণতি খারাপ হবে বলে হুমকি দিয়ে যায় কোম্পানির লোকেরা। ভয় না পেয়ে ফাগুন প্রতিবেদনটি না সরানোর সিদ্ধান্তে অটল ছিল। তবে প্রিয়.কম কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদনটি সরিয়ে নেয় সাইট থেকে। কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্ত না মেনে নিতে পেরে ওইদিন অফিস থেকে রাগ করে বেরিয়ে যায় সে। ঘটনার পর ভালোবাসার সঙ্গেসঙ্গে তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধও বেড়ে যায় আমার।

তিন.

ফাগুন অন্যের মৃত্যুর নেপথ্যের সত্য উন্মোচন করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিল। অনেক দিন পেরিয়ে গেলেও সেই ফাগুনে হত্যার কারণ এখনও অজানা। সেটার হদিস করতেই সবাই গত শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনে মিলিত হয়েছিলাম। এসেছিলেন বিভিন্ন সংবাদ প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা।

যদিও বিকাল ৩টার পর মানববন্ধন শুরু হলে পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মধ্যেই বিদায় নিয়েছিলাম আমি। সেদিন বিকেল ৪টায় অফিসে সাপ্তাহিক সভা থাকায় চলে আসতে হয়েছিল আমাকে। তাই চলে যাওয়ার সময় শেরপুর থেকে আসা ফাগুনের বাবা কাকন রেজা ও তার আত্মীয়-স্বজনদেরও সঙ্গে দুটো কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে মানববন্ধন শুরুর ঘণ্টা দেড়েক আগে সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলাম বলে কাকুর (কাকন রেজা) সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। আমার পিঠে হাত রেখে তিনি বলছিলেন, ‘কোটা বিরোধী আন্দোলনের সময় তোমাদের অফিস যখন আক্রান্ত হলো, তখন ফাগুন তোমার কথা বলেছিল। ফাগুন বলেছিল, বাবা আমরা তো কিছু করতে পারলাম না।’ এরপর হ্যাঁ-না টাইপ দু-একটা কথা বলার পর কাকুর মুখের দিক কেন যেন আর তাকাতে পারিনি।

অফিসে চলে আসলেও মনটা পড়েছিল মানববন্ধনেই। সভা শেষে অফিসে বসেই সংবাদ করার স্বার্থে ফেসবুক লাইভ থেকে পুরো মানববন্ধনের ভিডিও দেখেছিলাম। কাকু মানববন্ধনে বলছিলেন, ‘তার ফাগুনের মতো আর কোনো ফাগুনকে এমন নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে যেন বিদায় নিতে না হয়।’ কাকু এমনটা প্রত্যাশা করবেন, সেটাইতো স্বাভাবিক। 

এই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কাকুর এ প্রত্যাশা বাস্তব হবে কি?হলেতো টগবগে ফাগুনকে খুনই হতে হতো না।  আর খুন হওয়ার পর মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কে বা কারা খুন করেছে, কেন করেছে – কোনো প্রশ্নেরই উত্তর মেলেনি। তিল তিল করে বড় করা কাকু-কাকী হয়তো কোনো দিন জানতেও পারবেন না, কেন তারা সন্তানকে পৃথিবী থেকে অকালে বিদায় নিতে হলো। তারা এও জানতে পারবেন না – বাবার (কাঁকন রেজা এনটিভির শেরপুর প্রতিনিধি) কর্মক্ষেত্রের শত্রুতায়, নাকি ফাগুনের নিজের কর্মক্ষেত্রের শিকার, কিংবা ছিনতাই করার এক পর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে, নাকি অন্য কোনো কারণে তাদের সন্তানকে খুন করা হয়েছে। সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রে জীবন আর মরণের অধিকার যে রাষ্ট্রের, সেই রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তরা কোনও প্রশ্নের জবাবই এখন পর্যন্ত দিতে পারেনি। রাষ্ট্র মাত্রই কি সবসময় এমন অকার্যকর একটা যন্ত্র মাত্র?

টিকে যাওয়া ফাগুনের খুনীরা যে আরেক ফাগুনকে খুন করবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? সেদিন মানববন্ধনে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলছিলেন, ‘মৃত্যুর পর মৃত্যু ঘটে, আমরা ভুলে যাই। কারণ এ ধরনের ঘটনা সংখ্যা এত বেশি যে, আমাদের ধারণ ক্ষমতাকে অতিক্রম করে চলে গেছে।’ এই হলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রূপ ও বাস্তবতা।

তাহলে কাকু যে স্বপ্ন দেখছেন, যেভাবে চাইছেন আর কোনও ফাগুন যেন এভাবে না চলে যায়, তা কি মিথ্যা হয়ে যাবে?  হুম, তাই যাবে বলে মনে হয় আপাত বাস্তবতায়। তবে সবাই সোচ্চার হলে, ফাগুন হত্যার মতো অন্য খুনগুলোর বিচার করতে রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে পারলে হয়তো ফাগুনদের অকালে চলে যাওয়ার পরিমাণ কমবে। তবে রাষ্ট্র কি সেটা করবে? আমার সে ব্যাপারে বিশ্বাস কম। আমি তাই মনে করি, নিজেরা সামাজিক সুরক্ষা তৈরি করতে পারলে, সবধরনের বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতিকে জাগরিত করতে পারলে, হয়তো সেই দিন ফাগুনের বাবার স্বপ্নটা পূরণ হবে। এখন পরিবারের কাছে অনেকে যেমন নিরাপদবোধ করেন; তখন সমাজে, প্রতিবেশীর কাছে, রাস্তাঘাটে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে – সব জায়গায় মানুষ নিরাপদবোধ করবে। রাস্তায় বের হলে ঘরে শঙ্কাহীনভাবে ফেরার নিশ্চয়তাটুকু থাকবে।

আমাদের অপেক্ষা, ফাগুনের বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ হবে।

লেখক: সংবাদকর্মী

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment