সহযোদ্ধার ভাবনাবিশ্ব 

অথচ চাইলেই স্কলারশিপ নিয়ে দেশ ছাড়তে পারত ফাগুন

সর্বশেষ আপডেটঃ

পড়তে সময় লাগবে: 4 মিনিট

তরুণ সাংবাদিক ইহসান ইবনে রেজা ফাগুনের রহস্যজনক মৃত্যুর এক বছর পার হয়ে গেল। আমরাও ধীরে ধীরে ভুলতে বসেছি ফাগুনকে। ব্যস্ততা, কাজ, একের পর এক নতুন ঘটনার মোড়কে অনেকটা আড়ালেই চলে গেল ২১ মে ফাগুন রেজার মরদেহ উদ্ধারের দিনটি।

দীর্ঘ এক বছর ফাগুন রেজার মৃত্যু রহস্যের কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত বছরের এই দিনে ফাগুন ঢাকা থেকে বাড়ি যাওয়ার পর নিখোঁজ হয়, পরে তার মরদেহ পাওয়া যায় জামালপুরে। মাঝখানে একটি বছর চলে গেল, ফাগুনের খুনের বিষয়ে কিছুই জানা গেল না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বলছেন, তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন এই চেষ্টা ঠিক কত দিনে সফল হয়, কত দিন ফাগুনের হত্যাকারীদের সম্পর্কে জানা যাবে, সেই অপেক্ষাই করতে হচ্ছে।

অপেক্ষা ছাড়াও তো কিছু করার নেই। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে প্রায় দিনই খুবই ছোটখাটো বিষয় নিয়েও খুনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এমন কোনো দিন নেই, অনলাইনে বসলে খুনের খবর পাওয়া যায়নি। অনলাইনের কথা বললাম এ কারণে যে, প্রায় বছরখানেক হলো, পত্রিকার পাতা খুব একটা দেখা হয় না। অনলাইন পোর্টালে কাজ করি, তাই সব অনলাইনেই দেখা হয়। যেসব হত্যার খবর পত্রিকায় আসে, সেগুলোর কয়টারই বা রহস্য উন্মোচন হয়? আর কয়টার বিচার হয়? আবার বিচার যে একেবারেই হয় না, তা-ও নয়। সেজন্যই অপেক্ষায় থাকা। তবে অপেক্ষা করতে করতে বছর চলে গেলেও যখন সেই বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শূন্যের ওপর ভাসে, তখন অবশ্য আর অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করে না। বিশ্বাস ওঠে যায়। আমার এখনো বিশ্বাস না উঠলেও অনেকেরই বিশ্বাস নেই। চারপাশের যে পরিস্থিতি, আর যিনি বা যারা পরিস্থিতির শিকার, তারা কীভাবেই বা বিশ্বাস করবেন। আবার মাঝে মাঝে এমন খবরও পাওয়া যায়, নিশ্চিত খুনি জানার পরেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। খুনি উল্টো হুমকি-ধামকি দিয়ে বেড়ান ভুক্তভোগীকে। আর ফাগুন হত্যার বিষয়টা তো এখনো অজানা, এখনো শূন্যে ভাসছে।

ফাগুন পড়াশোনা করত তেজগাঁও কলেজে, পাশাপাশি সাংবাদিকতায় নাম লেখায়। প্রিয়.কমের ইংরেজি সেকশনে সাব-এডিটর হিসেবে কাজ শুরু করে। একসময় ইংরেজি সেকশনটা বন্ধ হয়ে গেলে সে প্রিয়’র সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে কাজ করছিল। অনলাইন সম্পর্কে তার ধারণাও বেশ পাকাপোক্ত ছিল। কী করলে অনলাইনে পাঠক বাড়বে, ফেসবুকে লাইক/ফলোয়ার বাড়বে, অ্যাঙ্গেজমেন্ট বাড়বে, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবে সাবস্ক্রাইবার বাড়বে, তা নিয়েও কাজ করছিল। ফটোশপে নায়ক-নায়িকাদের ছবিগুলো এডিট করে আরও সুন্দর করে ফেসবুকে, ইনস্টাগ্রামে দিত। ভিডিও করে এবং তা এডিট করে ইউটিউব দিত। এবং তা সত্যিই কাজ করছিল, অ্যাঙ্গেজমেন্ট বাড়ছিল, ফলোয়ার বাড়ছিল। শুধু অনলাইন সম্পর্কেই নয়, অনেক বিষয়েই তার ধারণা পরিষ্কার ছিল। আবার ধারণা না থাকলে বলত, সেটি জানা নেই। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার সেই বিষয় সম্পর্কে বলে দিতে পারত। হয়তো গুগল বা ইউটিউব থেকে তা জেনে নিত। যেটা আমরা অনেকেই জানতে চেষ্টা করতাম না। না-জানা থাকলে সেটার ইস্তফা দিয়ে দিতাম!

ইংরেজিতে দারুণ দক্ষ ছিল। ইংরেজি শেখার একটি প্রতিষ্ঠানে আইইএলটিএস দেওয়ার আগেই সে ওই প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি শেখানোর অফার পেয়েছিল। যদিও সেটা সে বেছে নেয়নি। বেছে নিয়েছিল সাংবাদিকতা করবে। আমরা যারা এই পেশায় আছি, জানি, কী অনিশ্চিত এক পেশা এটা। বিষয়টা ফাগুনও জানত। কারণ ওর বাবা সাংবাদিক, ছিলেন দাদাও। তবুও এদিকেই এসেছিল সে। অথচ চাইলেই স্কলারশিপ নিয়ে সে দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারত। কিন্তু যায়নি।

একদিন হুট করেই চাকরিটা ছেড়ে দেয়। চাকরি ছাড়ার দেড় মাস পর ২২ মে খবর পাই, আগের দিন রাত থেকে ফাগুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। ঢাকায় একটি অনলাইন পোর্টালে ইন্টারভিউ দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে সে নিখোঁজ। পরদিন দুপুরে তার মরদেহ শনাক্ত করা হয়। জামালপুর রেলওয়ে পুলিশ জানায়, ২১ মে রাতে খবর পেয়ে নান্দিনা মধ্যপাড়া নামের এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

২১ মে জাগোনিউজ২৪ডটকমের ইংরেজি সেকশনে কাজের বিষয়ে সাক্ষাতকার দিয়েছিল ফাগুন। সে তার বাবাকে জানিয়েছিল, সাক্ষাতকার ভালো হয়েছে খুবই। প্রতিষ্ঠান পজিটিভ। সেদিনই বাড়ি ফেরার পথে খুন হয় ফাগুন। সংবাদমাধ্যমে আর কাজ করা হলো না তার। তবে অবাক করার মতো বিষয়টি হচ্ছে, যে সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাতকার দিতে এসে ফাগুন খুন হয়, সেই সংবাদমাধ্যম ফাগুনের হত্যা পরবর্তী সময়ের সংবাদ এড়িয়ে গেল। ফাগুনের হত্যাকারীদের শনাক্ত ও বিচারের দাবিতে আমরা তার সহকর্মীরা গত বছরের ২৯ জুন একত্রিত হয়েছিলাম জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে। এখানে ছিলেন ফাগুনের বাবা কাকন রেজা, ফাগুনের জেঠা আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। যতটুকু জানি, এই বিচার দাবির একটি সংবাদ সবার আগে জাগোনিউজের জমা দেন প্রতিবেদক। কিন্তু ২৪ ঘণ্টায়ও তা প্রকাশ হয়নি। এই নিউজ প্রকাশের সময় না পেলেও সংবাদমাধ্যমটি প্রেস রিলিজ প্রকাশ ঠিকই করেছে। পরের দিন, কেন প্রকাশ করা হলো না, কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করলে তারা জানায়, অফিসে লোক ছিল না, দিতে পারেনি। ওই দিন পরে ছোট করে নিউজটা অবশ্য দিয়েছে। এরপর কেল্লাফতে! সেখানেই সমাপ্ত। অথচ আশা করেছিলাম, তারা এ নিয়ে নিয়মিত আপডেট দিবে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। এরপর সম্ভবত ওই অনলাইনে আর একটি শব্দও প্রকাশ হয়নি ফাগুন ইস্যুতে!

দুটি টেলিভিশনের প্রতিবেদক সেই সংবাদের কপি তাদের হাউজে দিলে কর্মরত দুজন তাচ্ছিল্য করেছেন বলে শুনেছি। এরমধ্যে একটি টেলিভিশন তা প্রচারই করেনি। ওই দিন রাতে সময় টেলিভিশনে দায়িত্বে থাকা এক নিউজরুম এডিটর নাকি বলেছিলেন, আরে ধুর, এসব দিয়া কি হবে, দরকার নেই। তিনি এটাকে প্রচারের যোগ্য মনে করেননি। অথচ প্রতিবেদক কষ্ট করে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। আর নিউজরুমে থাকা একজন সেটাকে বাতিল বলে দিলেন। পরে সেটি প্রচার হয়েছিল কি না, সেই খোঁজ নেওয়ারও ইচ্ছে হয়নি।

অথচ রাত ১২টার দিকে সংবাদটি পেয়েও পরদিন প্রথম আলো ও কালের কণ্ঠ তাদের ছাপা পত্রিকায় নগর সংস্করণে তা প্রকাশ করেছে।

সংবাদমাধ্যমে ফাগুনকে নিয়ে খবর এই পর্যন্তই। এরপর আর কোনো খবর হয়নি, ফলোআপ হয়নি। কেবল লিখে যাচ্ছেন ফাগুনের বাবা সাংবাদিক কাকন রেজা। যদিও শুধু ফাগুন নয়, সব হত্যা নিয়েই সময় পেলেই লিখছেন তিনি। ফাগুনের বিষয়েও লিখছেন ওই একজনই। বাবা হয়ে ছেলের মরদেহ কাঁধে নিয়েছেন, মরদেহ উদ্ধারের সংবাদ লিখেছেন, পরবর্তী সময়ে ছেলে হত্যার বিচার নিয়েও লিখছেন। আর কারো লেখা তেমন চোখে পড়েনি। সম্ভবত লিখেনি কেউ, লিখলে চোখ এড়ানোর কথা নয়।

ফাগুনের পরিবার ও সহকর্মীরা শুরু থেকেই বলছেন, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনের দাবি তাদের। কিন্তু এখন পর্যন্ত হত্যামামলার কোনো কিনারা খুঁজে পায়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

২১ মে বৃহস্পতিবার এ নিয়ে কথা হচ্ছিল জামালপুর রেলওয়ে থানার দুজন কর্মকর্তার সঙ্গে। তাদের দাবি, হত্যার রহস্য উদঘাটনে চেষ্টা তারা করছেন। একজন গ্রেপ্তার হয়েছে। তার কাছ থেকে তথ্যও পাওয়া গেছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী একজনকে গ্রেপ্তারের জন্য কয়েকবার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ। তাকে ধরতে পারেনি। সবশেষ দুই মাস থেকে করোনার কারণে মুভমেন্টও হচ্ছে না। ফলে এই মুহূর্তে অনেকটাই আটকে আছে তদন্তের কাজ।

রেলওয়ে পুলিশের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তদন্তের কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। তবে সামনের কাজটুকু যদি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) করে, তাহলে খুবই ভালো হবে। না-হলে যতটুকু কাজ এগিয়েছে, হয়তো সেকাজেও ভাটা পড়তে পারে বলে তাদের আশঙ্কা!

এদিকে তদন্ত কর্মকর্তারও বদলির আদেশ হয়েছে। শিগগিরই তিনিও অন্যত্র বদলি হবেন।

ফাগুনের হত্যার রহস্য উন্মোচন হোক। রেলওয়ে পুলিশ সুরাহা না করতে পারলে পিবিআই করুক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে আশার আলো নিয়ে তাকিয়ে ফাগুনের পরিবার ও সহকর্মীরা। সেই আলো পরিস্ফুটিত হোক।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment